এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: কয়লা পাচারে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) তল্লাশি অভিযান নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের মামলায় বুধবার ইতি টেনে দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। আর ইডির বিরুদ্ধে দায়ের করা কলকাতা ও রাজ্য পুলিশের চারটি এফআইআরে সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার স্থগিতাদেশ দিল। অর্থাৎ, দক্ষিণ কলকাতার লাউডন স্ট্রিটে ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং সল্টলেক সেক্টর ফাইভে তাঁদের অফিসে এক সপ্তাহ আগে তল্লাশি চালানোর জন্য ইডির বিরুদ্ধে কলকাতা ও বিধাননগর কমিশনারেট যে চারটি মামলা দায়ের করে তদন্ত চালাচ্ছিল, তা আপাতত স্থগিত হয়ে গেল। লাউডন স্ট্রিট ও সেক্টর ফাইভের দু’টি ঘটনাস্থল এবং আশপাশ এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংরক্ষিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। দু’সপ্তাহের মধ্যে মামলার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ অর্থাৎ রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার সিপি–সহ সবাইকে হলফনামা দিয়ে তাঁদের বক্তব্য জানাতে হবে। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে ৩ ফেব্রুয়ারি।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পিকে মিশ্র ও বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির এজলাসে দু’টি অর্ধে এ দিনের দীর্ঘ শুনানির শেষে এইটুকু যদি নির্যাস হয়ে থাকে, তা হলে তা থেকে এই মামলাটির গুরুত্ব বোঝা যাবে না বলেই মনে করছেন প্রবীণ আইনজ্ঞরা। কারণ, বিচারপতিরা নিজেরাই এই মামলার গুরুত্ব আলাদা করে জানিয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট, বাংলায় বিধানসভা ভোটের মুখে রাজ্যের শাসকদলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ আইপ্যাকের অফিসে তল্লাশি এবং তার জেরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপড়েনের বিষয়টিকে তারা ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখতে রাজি নয়। গোটা দেশেই ইডির এক্তিয়ার নিয়ে একাধিক রাজ্য এই কেন্দ্রীয় এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিভিন্ন হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে। এই আবহে এ দিন বিচারপতি মিশ্র ও বিচারপতি পাঞ্চোলির বেঞ্চ বলেছে, ‘আমাদের প্রাথমিক দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এই আবেদনে ইডি বা অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তে কোনও রাজ্যের সংস্থার হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আইনের শাসন বজায় রাখতে এবং প্রতিটি সংস্থাকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে দেওয়ার স্বার্থে বিষয়টি বিচার করা প্রয়োজন। যাতে কোনও বিশেষ রাজ্যের আইন রক্ষাকারী সংস্থার কেউ অভিযুক্ত হলেও ছাড় না পেয়ে যায়।’
বস্তুত গত বৃহস্পতিবারের ইডি অভিযান ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর ছাপিয়ে যে ভাবে কেন্দ্রীয় এজেন্সির অফিসারদের বাধাদান, তাঁদের কাছ থেকে নথি ছিনিয়ে নেওয়া এবং রাজ্য পুলিশের এফআইআর করার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে, সেই সামগ্রিক অরাজকতার আশঙ্কাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে আদালত। তাই আদালতের বক্তব্য, ‘এক্ষেত্রে গুরুতর অভিযোগ অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি পরীক্ষা না করলে দেশের কোনও অংশে আইন–শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটতে পারে।’
এ দিনের শুনানিতে রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে প্রবীণ আইনজীবীরা বারবার যুক্তি দেন, আইপ্যাকের অফিস বা তার কর্ণধারের বাড়িতে তল্লাশি আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থারই কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলিরও কোনও সৎ ও বৈধ তদন্তে বাধা দেওয়ার অধিকার নেই।’ অর্থাৎ, ইডির এই তদন্ত বা তল্লাশি যে অবৈধ, এমনটা প্রাথমিক ভাবে মনে করছে না আদালত।
যদিও আদালতের প্রথম দিনের পর্যবেক্ষণের পরেও ইডির ভূমিকা নিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ দিন পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে তিনি বলেন, ‘কোর্টের ম্যান্ডেট রয়েছে নির্দেশ দেওয়ার। সুপ্রিম কোর্ট যদি নির্দেশ দিয়ে থাকে, অসুবিধার কী আছে? মামলা তো চলবে, মামলা শেষ হয়ে যায়নি। পরের শুনানির দিন আবার লড়াই হবে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আইপ্যাকের শুধু বাংলার অফিসে তল্লাশি করলেন কেন? আইপ্যাকের অফিস হায়দরাবাদ, তামিলনাড়ুতেও রয়েছে। সেখানে তল্লাশি করলেন না! আইপ্যাকের তিন জন ডিরেক্টর রয়েছেন। আপনি তাঁদের বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি করলেন না! শুধু এখানে তল্লাশি করলেন।’ এরপরে তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ সংযোজন, ‘এই তল্লাশি সংক্রান্ত কিছু তথ্য আমাদের হাতেও রয়েছে। যাঁরা সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টে মিথ্যা কথা বলছেন, আগামী দিনে আমরা কনটেম্পট অফ কোর্ট করে কিছু তথ্য হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের কাছে যদি তুলে ধরি, পালানোর জায়গা পাবেন না।’
এ দিন আদালতে কেন্দ্রের সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা যুক্তি দেন, ‘এখানে একটি সংস্থার অফিস এবং তার কর্ণধারের বাড়িতে তল্লাশি করা হয়েছে৷ ইডি লোকাল থানাকে জানিয়ে তল্লাশি করতে গিয়েছিল৷ যে নথি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছিল, তার পাশাপাশি একজন ইডি অফিসারের মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ হতবাক এবং স্তব্ধ করে দেওয়ার মত ঘটনা এটা। এই ধরনের ঘটনা কেন্দ্রীয় এজেন্সির মনোবল ভেঙে দেবে৷’ ডিজিপি, সিপি সমেত যে পুলিশ আধিকারিকরা তদন্তে বাধা দিয়েছেন, তাঁদের সাসপেন্ড করে বিভাগীয় তদন্তের আর্জিও জানায় ইডি।
অতীতে আর এক কেন্দ্রীয় এজেন্সি সিবিআইয়ের অভিযান বা তল্লাশি চলাকালীনও এ ভাবে রাজ্যের শাসকদল ও পুলিশ বাধা দিয়েছে বলেও উদাহরণ দেন মেহতা। তিনি বলেন, ‘এর আগে সিবিআই অফিসারদের গ্রেপ্তার করে থানায় বসিয়ে রাখা হয়েছিল৷ মুখ্যমন্ত্রী নিজে সেই সময়ে বাধা দিয়েছিলেন৷ এখন যিনি ডিজি, সেই সময়ে তিনি ছিলেন সিপি৷ তিনি নিজে এবং তাঁর পুলিশ সিবিআইকে বাধা দিয়েছিল তদন্ত করতে৷ রাজ্যের আইনমন্ত্রী আদালতে ঢুকে গিয়েছিলেন পাঁচ হাজার লোক নিয়ে, স্লোগান তুলে শুনানি বন্ধ করে দিয়েছিলেন৷’
কয়লা পাচারের যে ঘটনা নিয়ে সে দিন ইডি তল্লাশিতে গিয়েছিল, তারও বিস্তারিত জানানো হয় আদালতকে। আইপ্যাকের প্রসঙ্গ উঠতে বিচারপতি মিশ্র জানতে চান, ‘এটা কি সেই সংস্থা যেখানে আগে প্রশান্ত কিশোর ছিলেন?’ মেহতা জানান, এটা সেই সংস্থাই। তল্লাশির দিন যে ভাবে মুখ্যমন্ত্রী বা পুলিশকর্তারা অকুস্থলে ঢুকে পড়েন, তারও কিছু ছবি আদালতে জমা দিয়েছে ইডি। হাইকোর্টে গত শুক্রবারের শুনানি যে ভাবে ভিড় উপচে পড়ায় স্থগিত হয়ে যায়, তা নিয়েও অভিযোগ তোলে তদন্তকারী সংস্থা। বিচারপতি মিশ্র জানতে চান, ‘রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন কে পরিচালনা করেন? নির্বাচন কমিশন, না আইপ্যাক?’
মুখ্যমন্ত্রীর তরফে আইনজীবী কপিল সিবাল বলেন, ‘এই মামলার শুনানি করা উচিত কলকাতা হাইকোর্টের৷ বিশৃঙ্খলার কথা বলে তারা মামলা পিছোতে চাইছে।’ তাঁর আরও যুক্তি, ‘২০২১–এ আইপ্যাকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে তৃণমূলের৷ ইডি জানত যে, এই অফিসে তল্লাশি চালালে নির্বাচন সংক্রান্ত প্রচুর তথ্য পাওয়া যাবে৷ ভোটের মুখে এই তল্লাশির কী প্রয়োজন?’ তাঁর সংযোজন, ‘দলের চেয়ারম্যান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর পূর্ণ অধিকার ছিল আইপ্যাকের অফিসে যাওয়ার৷’ এরপরে ইডির সে দিনের তল্লাশির পঞ্চনামা তুলে ধরে তাঁর যুক্তি, সেখানে শান্তিপূর্ণ ভাবে তল্লাশির কথা বলা হয়েছে। তারপরেও কী ভাবে ইডি নথি চুরি–ডাকাতির অভিযোগ তুলছে?
রাজ্যের কৌঁসুলি অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি যুক্তি দেন, ‘কলকাতা হাইকোর্টেই মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি হয়েছে। তারপরেও সুপ্রিম কোর্টে সমান্তরাল শুনানির আবেদন জানিয়েছে ইডি। এটা তো ফোরাম শপিং।’
বস্তুত পরে অভিষেকও সাংবাদিকদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার সময়ে এই প্রসঙ্গগুলি উত্থাপন করেন। বলেন, ‘আপনারা শুধু ইডির পঞ্চনামা দেখবেন। যেটা বলা হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী জোরজবরদস্তি তথ্যপ্রমাণ নিয়ে চলে গিয়েছেন,...(তার পরে) ইডির পঞ্চনামা পড়ে দেখুন।’ তাঁর সংযোজন, ‘সুপ্রিম কোর্ট ঠিক করবে চূড়ান্ত শুনানি কোথায় হবে— সুপ্রিম কোর্টে, নাকি হাইকোর্টে। ইডি চায় না এই শুনানি হাইকোর্টে হোক। যে পিটিশন দায়ের করেছিল (হাইকোর্টে) সেই পিটিশনের অ্যাডজর্নমেন্ট চাইছে। একদিন হাইকোর্টে ফাইল করার পরে সুপ্রিম কোর্টে ফাইল করেছে। হাইকোর্টে কেস ফাইল করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমন কী হলো যে সুপ্রিম কোর্টে ফাইল করে হাইকোর্টে অ্যাডজর্নমেন্ট চাইল?’
এ দিন দীর্ঘ শুনানির পরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা জানিয়ে দেন, এই মামলার পরবর্তী শুনানি তাঁরা করবেন। তার মধ্যে সব পক্ষকে তাদের হলফনামা দিতে হবে।