এই সময়: নিপা আক্রান্ত দুই নার্সের শারীরিক অবস্থার অভাবনীয় উন্নতি দেখা গিয়েছে বৃহস্পতিবার। পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার বাসিন্দা ব্রাদার-নার্সকে এ দিন বের করা হয়েছে ভেন্টিলেশন থেকে। তাঁর জ্ঞান ফিরেছে। তিনি উঠে বসেছেন বেডে, কথাও বলেছেন। পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার বাসিন্দা সিস্টার-নার্সের অবস্থা এখনও সঙ্কটজনক ঠিকই। কিন্তু ভেন্টিলেশনে এখনও কোমায় থাকলেও আগের চেয়ে তাঁর অবস্থারও অনেকটাই উন্নতি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তিনি এ দিন সামান্য হলেও হাত-পা নেড়েছেন, চেষ্টা করেছেন চোখ খোলারও। যদিও চিকিৎসকরা কাউকেই এখনও সঙ্কটমুক্ত বলতে নারাজ।
স্বাস্থ্যকর্তারা জানাচ্ছেন, অসম এই যুদ্ধ জয়ের নেপথ্যে রয়েছে অ্যান্টিভাইরাল ‘রাইবাভিরিন’-সহ বেশ কয়েকটি ওষুধ, যেগুলি দ্রুত ব্যবহার করে সাফল্য মিলেছিল কেরালাতেও। তাই নিপার সংক্রমণকে বাগে আনতে বারাসতের বেরসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই নার্সের উপর ওই ওষুধগুলি প্রয়োগে কালমাত্র দেরি করা হয়নি। এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরে ব্রাদার-নার্স তুলনায় আগে ওষুধগুলি পেয়েছেন বলে, তাঁর উন্নতিও হয়েছে চোখে পড়ার মতো।
এ দিন দুই নার্সের সংক্রমণের উৎস সম্পর্কে নতুন তথ্য জানতে পেরেছেন কেন্দ্রীয় ‘ন্যাশনাল জয়েন্ট আউটব্রেক রেসপন্স টিম’ (এনজেওআরটি)-এর সদস্যরা। স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে খবর, প্রথমে মনে করা হয়েছিল, সিস্টার-নার্সের বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া নদিয়ার ঘুগরাগাছি গ্রামে যাওয়ার জেরে সংক্রমিত হওয়া কিংবা তাঁর থেকে ব্রাদার-নার্সের শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। পরে জানা যায়, সেটা নয়, বরং ওই দুই নার্স বারাসতের বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রায় একসঙ্গেই সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন কোনও অভিন্ন উৎস থেকে।
কারণ, বারাসতের কাজিপাড়া এলাকার বাসিন্দা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক পঞ্চাশোর্ধ্ব রোগিণীর পরিচর্যা করেছিলেন ওই দুই নার্স। প্রৌঢ়া অজানা জ্বরে ভুগছিলেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রবল শ্বাসকষ্ট নিয়ে তাঁকে গত ১৯ ডিসেম্বর বারাসতের ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ২২ তারিখ তিনি মারা যান। আর ২০ ও ২১ তারিখে নাইট ডিউটিতে ওই রোগিণীর পরিচর্যার দায়িত্বে ছিলেন এই দুই নার্স। মনে করা হচ্ছে, ওই রোগিণীর হয়তো নিপা সংক্রমণ হয়েছিল যা বাস্তবে ধরাই পড়েনি আমৃত্যু। তাঁর থেকেও এই দুই নার্সের নিপা হয়ে থাকতে পারে।
অর্থাৎ, ওই দুই নার্স একে অন্যের থেকে সংক্রমিত হননি। স্বাস্থ্য দপ্তরের সরকারি রিপোর্টেও তাই এ দিন সিস্টার নার্সকে ‘নট ইনডেক্স কেস’ (প্রথম সংক্রমিত নন) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে আরও নিশ্চিত হতে ওই হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হচ্ছে। বিষয়টি আরও তলিয়ে দেখতে এ দিন বারাসতের কাজিপাড়ায় ওই প্রৌঢ়ার বাড়িতে যান কেন্দ্র ও রাজ্যের বিশেষজ্ঞ দল। বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা। জানা যায়, ফুসফুসে সংক্রমণের পাশাপাশি তাঁর বমি ও মানসিক বিভ্রমের মতো উপসর্গও ছিল।
এ দিন প্রাণী পর্যবেক্ষণের একটি কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞ দলও রাজ্যে এসে কাজ শুরু করেছে। তবে স্বাস্থ্যভবন বৃহস্পতিবার অনেকটাই স্বস্তিতে মূলত দু’টি কারণে। প্রথমত, নতুন করে আর কেউ আক্রান্ত না হওয়া। আর দ্বিতীয়ত, নিপা আক্রান্ত দুই নার্সের শারীরিক অবস্থার উন্নতি। এ যাবৎ প্রায় ১৫০টি নমুনা কল্যাণী এইমসের ল্যাবে পাঠানো হয়েছে নিপা টেস্টের জন্য। এর মধ্যে ছিল ওই দুই নার্সের ক্লোজ় কন্টাক্টে আসা ১৩ জনের নমুনাও। যেগুলির একটি রিপোর্টও পজ়িটিভ আসেনি। কম ঝুঁকিপূর্ণ ৫৮টি নমুনার মধ্যে ২৬ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। বাকিদের রিপোর্ট ‘পেন্ডিং’ রয়েছে এখনও। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের যে নার্স ও হাউসস্টাফ বুধবার উপসর্গ নিয়ে আইডি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তাঁদেরও দু’জনের নিপা টেস্টের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।
স্বাস্থ্যভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, দুই নার্সই বুধবার পর্যন্ত গভীর কোমায় ছিলেন। তাঁদের দু’ জনেরই ‘গ্লাসগো কোমা স্কেল স্কোর’ ৫-এর নীচে চলে গিয়েছিল। এই স্কোর ১ থেকে ১৫ পর্যন্ত হয়। ১৫ মানে একেবারে সচেতন। স্কোর যত নামে, চেতনা তত কমে। ১০-এর নীচে মানে কোমায় চলে যাওয়া। কিন্তু এ দিন যখন ব্রাদার-নার্সের ভেন্টিলেশন খোলা হয়, তখন তাঁর স্কোর ছিল ১৫-ই। আর সিস্টার-নার্সের স্কোর ছিল ৭ ও ১০-এর মাঝামাঝি। এই অসাধ্য সাধনের নেপথ্যে ‘কেরালা মডেলে’র চিকিৎসা রয়েছে বলেই মনে করছেন চিকিৎসকরা। কারণ, নিপায় মৃত্যুহার যেখানে প্রকোপ ও অঞ্চল ভেদে ৪০-৭৫% প্রায়, সেখানে কেরালায় গত বছর এই ধরনের চিকিৎসার কল্যাণেই ১২৫ জন আক্রান্তের মধ্যে মাত্র ১১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।
কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞ দলের এক সদস্যের কথায়, ‘কেরালায় ২০১৮-র নিপা প্রকোপের পর থেকেই আমরা আত্মবিশ্বাসী। ঠিক সময়ে অ্যান্টিভাইরাল থেরাপি শুরু করলে যে প্রাণ বাঁচানো যায়, সে ব্যাপারে আমরা এখন অনেক প্রত্যয়ী। সেইমতো এই দুই অচেতন নার্সকে রাইলস টিউবের মাধ্যমে রাইবাভিরিন খাওয়ানো হয়েছিল। সেই চিকিৎসায় সাড়া মিলতেই আমরা রেমডিসিভির নামের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধটি দিই ইন্ট্রাভেনাস রুটে। ফ্যাবিপিরাভির খাওয়ানোর প্রয়োজন পড়েনি। তাতেই প্রায় মিরাকল ঘটতে চলেছে!’ তিনি জানান, নিপা সংক্রমণের সন্দেহ থাকলে কিংবা আক্রান্তের সংস্পর্শে এলেও, উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগে এই রাইবাভিরিন ওষুধটি প্রায় প্রতিষেধকের মতো কাজ করে।
এ দিকে ২৪ ঘণ্টা নিপার নমুনা পরীক্ষার জন্য বেলেঘাটার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ ইন ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন’ বা ‘নিরবি’ (পূর্বতন নাইসেড)-কে নোডাল সেন্টার করা হয়েছে। নিরবি-র অধিকর্তা শান্তসবুজ দাস বলেন, ‘আতঙ্কের কোনও পরিবেশ বা পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। তাই আমজনতাকে মাস্ক পরা বা শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে না।’ তিনি জানান, নিপার কোনও সন্দেহভাজন রোগী এলে কী করতে হবে, কোথায় নমুনা পাঠাতে হবে, সে বিষয়ে রাজ্যের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকে নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে।