• এই পুজোকে বলা হয় 'শিয়াল ডাকা লক্ষ্মীপুজো'
    আজকাল | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: সংক্রান্তির পর পয়লা মাঘ থেকেই ধীরে ধীরে প্রকৃতিতে পরিবর্তন দেখা যায়। এইসময় পালিত হয় নানা লোকাচার। নানা প্রথা নিয়ে এইসব লোকাচারে এক সময়কার বাংলার সমৃদ্ধ জীবনপ্রবাহ ধরা আছে। যেমন, বর্ধমানের কাঞ্চননগরে কিছু পরিবারে এখনো পয়লা মাঘের দিন সন্ধ্যারাতে পালিত হয় 'শিয়াল ডাকা লক্ষ্মীপুজো'।

    পূর্ব বর্ধমানের কাঞ্চননগর এক সময় ছিল বর্ধমান রাজাদের রাজধানী। প্রায় দেড়শো বছর আগে মিঠাপুকুরের কাছে নতুন করে রাজবাড়ী নির্মিত হয়। কাঞ্চননগর একসময়ে সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্রও ছিল। নদীর ধারে অনেক ঝোপজঙ্গলও ছিল।  রাজবাড়ি সরে যাওয়ার পর কাঞ্চননগর অবহেলিত হয়ে পড়ে। সেখানকার জঙ্গলে একসময় প্রচুর শিয়াল,বাঘরোল,ময়ূর-সহ অসংখ্য প্রাণীর বাস ছিল। উদ্বাস্তু স্রোত আসার পর কাঞ্চন নগরে আবার জনবসতি বাড়তে থাকে। কাঞ্চন নগরে এখন আবার জমজমাট বসতি। এর মধ্যে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষের সঙ্গে আছেন কিছু পুরনো স্থানীয় বাসিন্দাও। এরকম কিছু পরিবারে 'শিয়াল ডাকা লক্ষ্মীপুজো'-র প্রথা আজও পালিত হয়। এরকমই একটি পরিবার হল কাঞ্চন নগরের সিংহ পরিবার। এই পরিবারের বধূরা আজও আন্তরিকভাবে এই পুজো করে আসছেন।

    কিছু নিয়ম আছে এই পুজোর। এই পুজোয় লাগে মুলো শাকের ফুল। এছাড়াও লাগে নানা ফল,মূল, এবং আরো নানা উপাচার। সিংহ পরিবারে আছেন দেড়শো বছরের পিতলের লক্ষ্মী। পিতলের রেকাবি এই পুজোর অন্যতম উপকরণ। পুরোহিত এসে পুজোয় বসেন সন্ধ্যার পর। শিয়ালের ডাক শুনতে পেলেই পুজো শেষ হত। তারপর প্রসাদ বিতরণের পালা। 

    গত শতাব্দীতে এই পরিবারের বধূ চারুবালা সিংহ এলাকায় সুপরিচিতা ছিলেন। প্রায় ১০৭ বছর আগে মিশনারি স্কুলে শিক্ষিতা এই নারী এই পুজো করে গেছেন। তাঁর পুত্রবধূ দুর্গাবালা সিংহ  শ্বাশুড়ির পরে এই প্রথাকে ধরে রাখেন। 

    কমলা সিংহ ৩০ বছর ধরে এই পুজোকে ধরে রেখেছেন। তিনি সুলেখক এবং সাংবাদিক উদিত সিংহের ঘরণী। এই বছর শীতের কামড় ভালই। তবুও বৃহস্পতিবার ১৫ জানুয়ারি এই লক্ষ্মীপুজো পালিত হল দুই শতাব্দীর পরম্পরার সম্মানে কাঞ্চনগর পশ্চিমপাড়ার এই সিংহ পরিবারে। উদিত সিংহের পিতা স্বর্ণকার ভবানচরণ সিংহ ছিলেন শহরে পরিচিত মানুষ। ৮৬ বছর বয়সে  চলে যাবার আগে তিনি মিঠাপুকুরে স্বর্ণকার হিসেবে নিজের কাজ করে গেছেন।

    তাঁর  স্মৃতিভান্ডারে আজকের বর্ধমান গড়ে ওঠার অনেক গল্প জমা ছিল। তিনি  রাণীদের গয়না পালিশ করতেন। বছরে দুবার। এই গয়না পালিশ করার জন্য তাকে 'জেনানা' মহলে যেতে হত। রীতিমতো খাতির করে রাজকর্মচারীরা তাঁকে নিয়ে যেতেন। রাজমহিষীর গয়না বলে কথা! এছাড়াও আই এফ এ শিল্ড-এ 'এনগ্রেভিং'-এর কাজ করেছেন ভবানীচরণ।

    এবারের এই দিনটা পড়েছিল বৃহস্পতিবার।  লক্ষ্মীবারে পরিবারে লক্ষ্মীশ্রী ধরে রাখতে হয়ে গেল এই লক্ষ্মীপুজো। ধূপ, দীপ জ্বেলে বন্দনা হল প্রাণের আকুতিতে। শুধু শিয়াল এখন অনেক কমে গেছে। অন্য অনেক জায়গায় শিয়ালের উৎপাত বাড়লেও জনবসতির চাপে শিয়ালরা এখন অন্য কোথাও ঠাঁই নিয়েছে। তাই শিয়াল না থাকলেও প্রথা কিন্তু রয়েই গিয়েছে।
  • Link to this news (আজকাল)