এই সময়: বিপন্মুক্ত না হলেও নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত দুই নার্স এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। তাঁরা দু'জনেই নিজেদের কর্মস্থল বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ–তে চিকিৎসাধীন। নতুন করে আর কারও শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়নি।
পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার বাসিন্দা ব্রাদার–নার্সকে বৃহস্পতিবারই সজ্ঞানে বের করা হয়েছিল ভেন্টিলেশন থেকে। তবে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার বাসিন্দা সিস্টার–নার্স এখনও কোমায় রয়েছেন। বৃহস্পতিবারের মতো শুক্রবারও তিনি হাত–পা নাড়িয়েছেন, চেষ্টা করেছেন চোখ খোলার। সকলকে স্বস্তি দিয়ে ওই দুই নার্সের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ১৭১টি নমুনার মধ্যে ইতিমধ্যেই ১৬৫টি নমুনার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।
এ দিকে নিপা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত ও সুসংহত করতে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর। এই গাইডলাইনে সংক্রমণের ঝুঁকি অনুযায়ী কন্ট্যাক্টদের শ্রেণিবিন্যাস, কোয়ারান্টিন, কেমো-প্রফিল্যাক্সিস, পরীক্ষা ও চিকিৎসা— সব কিছুই স্পষ্ট ভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোন কন্ট্যাক্ট কতটা ঝুঁকিপূর্ণ,কার ক্ষেত্রে কত দিন কোয়ারান্টিন থাকার কথা, তাঁদের কী পরিষেবা দেবে স্বাস্থ্য দপ্তর, কার কেমন চিকিৎসা হওয়া উচিত, কোন ওষুধ খেতে হবে রোগমুক্তি ও প্রতিরোধের জন্য— সে সবই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে নির্দেশিকায়। বলে দেওয়া হয়েছে কোন ওষুধ কোন গোত্রের সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও রোগীকে কোন ডোজ়ে খেতে হবে, তা–ও।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিশ্চিত বা সম্ভাব্য নিপা আক্রান্ত রোগীর যে কোনও দেহরস— রক্ত, লালা, থুতু, বমি, প্রস্রাব বা শ্বাসনালীর নিঃসরণ ইত্যাদির সংস্পর্শে এলে অথবা ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীর সঙ্গে বন্ধ জায়গায় কাছাকাছি থাকলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে 'হাই রিস্ক' হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এই শ্রেণির উপসর্গহীন কন্ট্যাক্টদের জন্য ২১ দিনের হোম কোয়ারান্টিন বাধ্যতামূলক।
তাঁদের প্রতিদিন স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারির আওতাতেও থাকতে হবে। কিন্তু কোনও রকম উপসর্গ (জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন) দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের নির্দিষ্ট আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি করে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে নিপা টেস্টের জন্য।
কিন্তু আক্রান্তের জামাকাপড়, বিছানার চাদর, লিনেন বা ফোমাইট স্পর্শ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে 'লো রিস্ক' হিসেবে ধরা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সংস্পর্শে আসার পর থেকে ২১ দিন তাঁর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে রাখার কথা বলা হয়েছে নির্দেশিকায়। তবে যদি তিনি উপসর্গহীন থাকেন, তবেই। উপসর্গ দেখা দিলে তাঁকেও অবিলম্বে আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি করে নিপা আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করতে হবে। গাইডলাইনে উল্লেখ করা হয়েছে, হাই রিস্ক কন্ট্যাক্ট এবং পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা–সরঞ্জাম ছাড়া রোগীর পরিচর্যায় যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কেমো-প্রোফাইল্যাক্সিস বিবেচনা করা হবে। সেই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসায় রাইবাভিরিন অথবা ফ্যাভিপিরাভির অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ খাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
উপসর্গযুক্ত ও আরটি-পিসিআর পজি়টিভ নিপা রোগীদের ক্ষেত্রে অবিলম্বে অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গাইডলাইনে। চিকিৎসা প্রোটোকলে রেমডিসিভিরের সঙ্গে রাইবাভিরিন বা ফ্যাভিপিরাভির ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে তাতে। প্রয়োজনে মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ব্যবহারের সংস্থানও রাখা হয়েছে গাইডলাইনে।
মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে নিউরোলজিস্ট ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে মাল্টি–ডিসিপ্লিনারি সাপোর্টিভ কেয়ারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রতি পাঁচ দিন অন্তর আরটি–পিসিআর পরীক্ষা করে দেখতে হবে, রোগী নিপা–নেগেটিভ হচ্ছেন কি না। কোনও শারীরিক সমস্যা না থাকলে, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দু' বার টেস্ট নেগেটিভ এলে, তবেই হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ পাওয়া যাবে বলা রয়েছে নির্দেশিকায়।