শিবরাম চক্রবর্তীর গল্প ‘গদাইয়ের গাড়ি’-তে যেমন গদাইয়ের জীবনে গাড়ি এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী, বাস্তব জীবনেও তেমনই। বাবার ইচ্ছা ছিল, গদাই বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবেন। যন্ত্রের সঙ্গে তাঁর নাকি জন্মগত বন্ধুত্ব—এই বিশ্বাস থেকেই সেই স্বপ্ন। কিন্তু জীবন সব সময় পিতৃ-পরিকল্পনার ছক মেনে চলে না। ইঞ্জিনিয়ারের বদলে গদাইচাঁদ দে বেছে নেন অন্য পথ। ওকালতির পড়াশোনা করেও শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে ওঠেন থানার দারোগা–আইনের রক্ষক, কিন্তু মনেপ্রাণে তিনি থেকে যান যন্ত্র আর গাড়ির প্রেমিক হয়ে। ইউনিফর্মের শাসন আর আইনের কঠোরতার আড়ালেও গদাইয়ের হৃদইয়ের দখল নিয়েছিল পুরোনো গাড়ির গুরুগম্ভীর শব্দ, ইঞ্জিনের মৃদু কম্পন।
দায়িত্ব আর নেশা–এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি আগলে রেখেছিলেন তাঁর উত্তরাধিকার। তিনি এই ১৯৩৮ সালের অ্যাডলার ট্রাম্পফ গাড়ির পিছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের রোমাঞ্চকর কাহিনী তুলে ধরেছেন। এই গাড়ির গল্প শুরু হয় চোরবাগানের দে বাড়িতে। গাড়িটির প্রথম মালিক ছিলেন হরিমোহন দে। পরে সেই মালিকানা যায় তাঁর স্ত্রী ভবাসুন্দরী দেবীর হাতে। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক গাড়িটির দায়িত্ব বহন করছেন তাঁদের পুত্র গদাইচাঁদ দে। তখনও কেউ জানত না, এই গাড়িকেই একদিন বাঁচাতে হবে যুদ্ধের ভয়াল সময়ে, মাটির নিচে লুকিয়ে রেখে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে কলকাতার বাতাসে যখন আতঙ্ক, সেইসময় ব্রিটিশ প্রশাসনের তরফে নির্দেশ আসে গভর্নরের স্ত্রীর এই লাল রঙের ১৯৩৮ এর অ্যাডলার গাড়িটি পছন্দ হয়েছে। তাঁর ব্যবহারের জন্য এই ইউরোপীয় গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করা হবে। ঠিক সেই সময় পরিবারের সম্মান ও সম্পত্তি রক্ষায় গদাই চাঁদ দে-র ঠাকুরদা মানিকলাল দে এক নিঃশব্দ অথচ সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। রাতের অন্ধকারে, বরানগরের বাগান বাড়ির উঠোনে মাটি খুঁড়ে ১৯৩৮ সালের অ্যাডলারকে লুকিয়ে ফেলা হয় মাটির নিচে। শুধু একটি গাড়ি নয়, পরিবারের সম্মান, স্মৃতি আর স্বাধীনতার ইচ্ছেকেই যেন তিনি মাটির তলায় আগলে রাখেন।
এরপর সময় বদলায়। যুদ্ধের ছায়া সরে যায়। আবার আলোয় ফিরে আসে সেই গাড়ি। যত্নে, ভালোবাসায়, স্মৃতির ভার নিয়ে ধীরে ধীরে আবার চলে রাস্তায়। দে পরিবারের কাছে অ্যাডলার ট্রাম্প্ফ তখন আর একটি বিলাসবহুল যান নয়, এটি হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকারই আবার ফিরে আসে আলোচনায়, ৫৫তম স্টেটসম্যান ভিন্টেজ অ্যান্ড ক্লাসিক কার র্যালি ২০২৬-এ। রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের পোলো গ্রাউন্ড থেকে পতাকা উত্তোলনের পর শুরু হওয়া র্যালিতে যখন দেড় শতাধিক গাড়ি কলকাতার রাস্তায় নামল, তখন ১৯৩৮ সালের অ্যাডলার ট্রাম্প্ফ জুনিয়র ছিল আলাদা করে নজরকাড়া।
তার চলন, রক্ষণাবেক্ষণ আর ইতিহাস—সব মিলিয়ে বিচারকদের চোখ থামল এই গাড়িতেই। এদিন গাড়িটি চালিয়ে আনেন গদাইচাঁদ দে-র কন্যা সুচেতা দে। চালকের আসনে বসে আত্মসম্মানের সঙ্গে ইতিহাস বহন করছিলেন তিনি। পিছনের সিটে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসেছিল গদাইচাঁদ দে-র দুই নাতি। শুধুমাত্র ১৯৩৮ সালের অ্যাডলার ট্রাম্প্ফ নয়, এই ভিন্টেজ অ্যান্ড ক্লাসিক কার র্যালিতে অংশ নিয়েছিল দে পরিবারেরই অন্য আরও দুটি গাড়ি–১৯৩৯ সালের মরিস এইট ও গদাইয়ের সেই অস্টিন গাড়ি।
ইতিহাসের উত্তরাধিকার আবার ফিরে এল দ্য স্টেটসম্যান আয়োজিত কার র্যালিতে। এল একের পর এক পুরস্কারও। ‘লেডি ড্রাইভার—কন্ডিশন অফ কার অ্যান্ড রোড’ বিভাগে এক্সাইড ট্রফিতে সম্মানিত হল ১৯৩৮ সালের অ্যাডলার ট্রাম্প্ফ জুনিয়র, ‘আউটস্ট্যান্ডিং কার অফ ইউরোপিয়ান অরিজিন’ বিভাগে আম্বুজা পুরস্কার, এবং ‘বেস্ট রোড পারফরম্যান্স’ বিভাগে অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন ট্রফি–সবই জিতে নিল এই প্রায় ৮৮ বছরের পুরোনো গাড়িটি। এছাড়া ১৯৩৯ সালের মরিস এইট গাড়িটিও একাধিক পুরস্কার জিতে নিয়েছে।
পুরস্কারের তালিকায় গাড়িটির মালিক হিসেবে উঠে আসে প্রয়াত ভবাসুন্দরী দেবীর নাম। তিনি গদাই দের মা। আজ তিনি আর নেই, কিন্তু এই গাড়ির প্রতিটি সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর স্মৃতি, তাঁর পরিবারের গল্প। ১৯৩৮ সালের অ্যাডলার ট্রাম্প্ফ জুনিয়র প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কিছু গাড়ি শুধু রাস্তায় চলে না, তারা সময়ের চাপানউতোর, ভালো-মন্দের ভেতর দিয়ে যাত্রা করে। মাটির নিচে চাপা পড়েও যে ইতিহাস বেঁচে থাকে, র্যালির মঞ্চে উঠে তা-ই একদিন গর্জে ওঠে।