‘আমি বাড়ি যাব না।’ মুখ গোঁজ করে বসে আছে বছর পনেরোর এক কিশোর। সদ্য গোঁফ গজিয়েছে। কিন্তু ছেলেমানুষি যায়নি। সামনে খাঁকি উর্দিতে দাঁড়িয়ে আছেন এক মহিলা। ধীর স্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা হলে কোথায় যাবে?’ উত্তর এল, ‘জানি না’। প্রায় দেড় ঘণ্টা এই চলল। অন্য কেউ হলে হয়তো হাল ছেড়ে দিতেন। কিন্তু রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্সের (RPF) চন্দনা সিনহা অন্য ধাতুতে গড়া। বাবা-বাছা করে কিশোরের পেট থেকে সব কথা বের করলেন তিনি।
শুধু ওই কিশোর নয়। গত তিন বছরে উত্তরপ্রদেশ রেল নেটওয়ার্কের প্রায় ১৫০০ শিশু-কিশোর উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন চন্দনা। তাদের মধ্যে কেউ পথ হারিয়ে স্টেশনে স্টেশনে ঘুরছিল, আবার কাউকে পাচার করে দিচ্ছিল দুষ্কৃতীরা। কেউ আবার শিশু শ্রমিক, কাজের টোপ দিয়ে ট্রেনে তোলা হচ্ছিল। শেষ মুহূর্তে চোখে পড়ে যায় চন্দনাদের। শুধু ২০২৪-এই তাঁর দল ৪৯৪ শিশুকে উদ্ধার করে। চন্দনা একাহাতে উদ্ধার করেছেন ১৫২ শিশুকে।
চন্দনার কাজ রেলের নজর এড়ায়নি। গত ৯ জানুয়ারি দিল্লিতে ভারতীয় রেলের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অতি বিশিষ্ট রেল সেবা পুরস্কার’-এ সম্মানিত করা হয় তাঁকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লখনউতে ফিরে আসেন তিনি। তখনই খবর পান ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এক শিশু বসে রয়েছে। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে লেগে পড়েন ‘কাজে’।
সেটা ২০২২ সাল। ছটপুজো চলছে। নয়াদিল্লির রেলস্টেশনে পা রাখার জায়গা নেই। তিন বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে ঘুরছিলেন এক মা। কিন্তু আচমকাই শিশুটি নেই। খোঁজ, খোঁজ। গোটা স্টেশন চত্বর তোলপাড়। প্রায় দুই ঘণ্টা পরে হদিশ মেলে শিশুটির। চন্দনাই খুঁজে দেন। কিন্তু সেই ঘটনা তাঁর জীবন বদলে দিয়েছিল।
২০২৪-এ ‘অপারেশন ননহে ফরিস্তে’-এর দায়িত্ব দেওয়া হয় চন্দনাকে। তার আগে, পরেও অনেক গুরুদায়িত্বই দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন তিনি। চন্দনার বয়স ৪১ বছর। ছত্তিসগড়ের বিলাসপুরে বড় হয়েছেন। ছোটবেলায় টিভিতে ‘উড়ান’ সিরিয়াল দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। তখনই ঠিক করে নেন, বড় হয়ে তিনিও ‘পুলিশ’ হবেন। স্বপ্ন পূরণ করেছেন চন্দনা। ২০১০ সালে RPF-এ যোগ দেন তিনি। এখন তিনি নিজেই লিখছেন ইতিহাস।