অয়ন ঘোষাল: পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে ভয়ংকর উতপ্ত হয়ে উঠেছে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা (Beldanga, Murshidabad)। রাস্তা, রেল অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে অহরহ। বেলডাঙায় খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত হন জি ২৪ ঘন্টার প্রতিনিধি সোমা মাইতি (Soma Maity)। মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয় চিত্র সাংবাদিক রঞ্জিত মাহাতোর। ছবি তুললে বন্ধ করে দেওয়া হয় ক্যামেরা। কেড়ে নেওয়া হয় প্রতিনিধির ফোন। সাংবাদিক সোমা মাইতি জানিয়েছেন, পুলিসের কাছে কাতর আর্তি জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি।
বেলডাঙায় সাংসদ ইউসুফ পাঠান
এবার নিহত পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের বাড়িতে যেতে দেখা গেল ইউসুফ পাঠানকে, স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক হাসানুজ্জামান ও দলীয় কর্মীদের নিয়ে ( (Yusuf Pathan)। এলাকাতেই ছিলেন, দাবি বহরমপুরের তৃণমূল সাংসদের। কোথায় তিনি? জোর খোঁজ চালিয়েছে বিরোধীরা। সাংসদের অনুপস্থিতি নিয়ে লাগাতার তুলোধনাও করেছে। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বললেন, 'আমি এখানেই ছিলাম। আমাদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, বিধায়করা মাঠে নেমে সর্বদাই কাজ করছেন।' আপনার লোকসভা এলাকায় বারবার এমন ঘটনা হচ্ছে, আপনি কেন আসেন না? এই প্রসঙ্গে ইউসুফ পাঠান বলেন, 'আমার মনে হয় আপনাদের ভুল বোঝান হচ্ছে, এসব কাজ দুঃখের বিষয় যে, মানুষকে তারা ভুল বোঝান। নিজেদের স্বার্থের জন্য লোকদের ব্যবহার করে। আপনাদেরও ব্যবহার করা হয়, যাতে সাধারন মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করা যায়। আমি এখানেই আছি আর মানুষের জন্য কাজ করছি'।
বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূল সাংসদের স্পষ্ট বক্তব্য, 'যা ঘটেছে, তা খুবই দুঃখজনক। দেশের পরিযায়ী শ্রমিকরা সকলে দেশের নাগরিক। রুটিরুজির জন্য হয়ত তাঁদের বাইরের রাজ্যে যেতে হয়। কিন্তু তাই বলে তাঁদের উপর এই অত্যাচার চলতে পারে না। আমি নিজে বারবার কেন্দ্রকে চিঠি লিখে এ বিষয়ে সতর্ক করেছি। এই পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর পর এখানে ভুল বোঝানো, উসকানি চলেছে সমানে। এখন পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত। আমি বরাবর এখানের মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। আমরা সবসময় তৃণমূল স্তরে কাজ করি। নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিবারের দেখভাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি, বাচ্চাদের শিক্ষা এবং অন্যান্য যা সাহায্য লাগে, আমরা সবই করব।'
তিনি জানান, ‘অভিষেক ব্যানার্জির তরফ থেকে মৃতের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আমি নিজে মৃত আলাউদ্দিনের নাবালিকা কন্যার নামে এক লক্ষ টাকা ‘ফিক্সড ডিপোজিট’ করে দিচ্ছি। ওই নাবালিকার উচ্চশিক্ষার যাবতীয় দায়ভার আমি গ্রহণ করছি।’
মোদীর বক্তব্য:
তৃণমূলের রাজত্বে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্য়ালয়েও মহিলারা সুরক্ষিত নয়'। বেলডাঙায় জি ২৪ ঘণ্টার প্রতিনিধি সোমা মাইতির উপর হামলার তীব্র নিন্দা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বললেন, 'বাংলার পরিবর্তন আনাই এখানকার যুবক ও মা-বোনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কালই দেখলাম, এক মহিলা সাংবাদিকের সঙ্গে তৃণমূলের গুণ্ডারা কত অভদ্রতা করেছে! প্রশাসন এতটাই নির্মম যে, মহিলাদের কথা কেউ শোনে না। নির্যাতিতার বাবা-মাকে কোর্টে যেতে হয়। এই পরিস্থিতিতে বদলাতে হবে'।
বেলডাঙায় অভিষেক
বেলডাঙায় যেখানে গত দুদিন ধরে প্রবল অশান্ত পরিবেশ, সেখান থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে, বহরমপুরের শনিবার রোড শো করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে বেলডাঙা অশান্তির নেপথ্যে তিনি সরাসরি বিজেপির উসকানিকে দায়ী করেছেন। নাম না করে নিশানা করেছেন দল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকেও। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের রোড শো থেকে শনিবার নাম না করে হুমায়ুন কবীরকে আক্রমণ করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ জানালেন, ‘গদ্দার’-এর প্রত্যক্ষ ইন্ধনেই অশান্তি হয়েছে বেলডাঙায়। এ প্রসঙ্গেই অভিষেক জানিয়েছিলেন, 'বেলডাঙায় যে পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুতে এত প্রতিবাদ হচ্ছে, তাঁর বাড়িতে বারবার যেতে চাইছেন ইউসুফ। আমাকে জানিয়েছেন। আমিই তাঁকে বলেছি, এখন নয়, পরিস্থিতি শান্ত হলে দলের কর্মীদের নিয়ে ওখানে যেতে।'
বেলডাঙায় অশান্তির সূত্রপাত
বেলডাঙায় অশান্তির সূত্রপাত শুক্রবার। মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিনকে ঝাড়খণ্ডে খুনের অভিযোগে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ১২ নম্বর (সাবেক ৩৪ নম্বর) জাতীয় সড়ক এবং রেলপথ প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে অবরোধ করে রাখেন বিক্ষোভকারীরা। ভাঙা হয় পুলিসের গাড়ি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও আক্রান্ত হন। শুক্রবারের ডামাডোলের পর শনিবার সকাল থেকে ফের উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়। বেলডাঙার বড়ুয়া মোড় অবরোধ করেন বিক্ষোভ দেখান কয়েকশো মানুষ। আবার অবরোধ করা হয় ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক। বেলডাঙা স্টেশন লাগোয়া রেলগেটে ভাঙচুর চালান বিক্ষোভকারীরা। বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ এলাকায় যান হুমায়ুন। তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘হঠকারী’ সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আর্জি জানান। অবরোধ তুলে নিতেও অনুরোধ করেন। তবে সে সবে চিঁড়ে ভেজেনি। পরে লাঠিচার্জ করে অবরোধ তুলেছে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয়েছে অন্তত ৩০ জনকে। তবে রেল চলাচল এখনও শুরু হয়নি।
হেল্পলাইন চালু, রেলের পরিষেবা স্থগিত:
ইতিমধ্যেই পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিসের তরফে একটি টোল ফ্রি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। পূর্ব রেলের তরফে জেলা পুলিসের কাছে অভিযোগ জমা পড়েছে। প্রচুর রেল সম্পত্তি ক্ষয়ক্ষতির জেরে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত কৃষ্ণনগর লালগোলা শাখায় সমস্ত রকম যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবা স্থগিত রাখা হয়েছে। রেলের তরফে বড় সংখ্যক আরপিএফ এবং আরপিএসএফ ফোর্স ইতিমধ্যেই উপদ্রুত স্টেশন এবং লেভেল ক্রসিং গুলিতে মোতায়েন করা হবে দ্রুত।
মূল মাথা মতিউর রহমান:
শুক্র এবং শনিবারের জাতীয় সড়ক অবরোধ অশান্তির ইন্ধন যোগান এবং জি ২৪ ঘণ্টার সাংবাদিক সোমা মাইতি কে আক্রমণের ঘটনায় সবমিলিয়ে এখনও পর্যন্ত ৩০ জনকে আটক করেছে মুর্শিদাবাদ পুলিস। এরমধ্যে সোমা মাইতিকে আক্রমণের মূল ইন্ধন এবং উস্কানি দেওয়া মতিউর রহমান আছে। ধৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেফতারি দেখিয়ে আদালতে পেশ করতে চলেছে পুলিস। বেলডাঙার বাসিন্দা এবং জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীর মতিউর রহমানকে স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তবে জেলার পুলিস সুপার মতিউর রহমান এর প্রকৃত পরিচয় এবং কোনও সম্ভাব্য রাজনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্কে কোনওরকম প্রশ্নের উত্তর সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছেন। মতিউরের সঙ্গে মিম এর সম্পর্কের জল্পনা তুঙ্গে উঠলেও এখনও পর্যন্ত এই ব্যাপারে অফিসিয়ালি কিছু জানানো হয়নি পুলিসের তরফে।
এখন কেমন আছেন সোমা মাইতি?
বেলডাঙার ঘটনায় আহত সাংবাদিক সোমা মাইতি হাসপাতাল থেকে গতকাল সন্ধ্যেবেলা নিজের বহরমপুরের বাসভবনে ফিরেছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে আপাতত সম্পূর্ণ বিশ্রামে আছেন তিনি।
সর্বমোট গ্রেফতার ৩০
বেলডাঙায় অশান্তির ঘটনায় মোট ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ জন শুক্রবার ও শনিবারের অশান্তির সঙ্গে জড়িত এবং ৪ জন সোমা মাইতির আক্রমণের ঘটনায়। মুর্শিদাবাদ জেলার পুলিস প্রশাসন বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।