• নিপা আউটব্রেকে চিন্তা নেই, এসে গেল অব্যর্থ প্রতিষেধক! জেনে নিন 'নিপা'কে রুখে দেওয়ার খুব চেনা এই...
    ২৪ ঘন্টা | ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
  • পার্থ চৌধুরী: নিপা (Nipah) থেকে সাবধান। নিপা ভয়ংকর সংক্রামক রোগ সন্দেহ নেই। এর কোনও ওষুধপত্র নেই, টিকা নেই। তাই আতঙ্কে মানুষ। ইতিমধ্যেই রাজ্যে ছড়িয়েছে নিপা। তবে, একটু হলেও আশার আলো আছে। কেননা, জানা গিয়েছে নিপার হাত থেকে বাঁচাতে পারে প্যাঁচা (Owl)! হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। লক্ষ্মী প্যাঁচা, কুটুরে প্যাঁচা, হুতোম প্যাঁচা-- এই সব প্যাঁচা মানুষকে নিপার হাত থেকে বাঁচাতে পারে (Owl Can Save Human from Nipah Virus)। এই প্রাকৃতিক প্রতিষেধক কাজ দিয়েছিল কোভিড-পর্বেও। সেই কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন বর্ধমানের কাঞ্চননগরে ডি এন দাস স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুভাষচন্দ্র দত্ত। শুধু মুখে বলা নয়, এ কথা হাতে-কলমে করে দেখিয়েওছেন গবেষক ড. সুভাষচন্দ্র। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত এই শিক্ষক গোটা স্কুলটিকেই তিলতিল করে গড়ে তুলেছেন প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে, গবেষণাগার হিসেবে। আর সেখান থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষকে পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

    কোভিড থেকে নিপায়

    কাঞ্চননগরে ড. সুভাষচন্দ্রের এই ডি এন দাস স্কুল বিখ্যাত নানা কারণে। একটি কারণ প্যাঁচাদের কলোনি। এই প্যাঁচারা কোভিড-পর্বে এই তামাম অঞ্চলের বাদুড় খেয়ে সাফ করে দিয়েছিল। এর ফলে বর্ধমানের উপকণ্ঠের কাঞ্চননগর, রথতলা, সাইফন এলাকায় সেভাবে থাবা বসাতে পারে কোভিড। মুখের কথাই শুধু নয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সায়েন্স জার্নালে সুভাষচন্দ্রের এই আবিষ্কার সমাদৃতও হয়েছে। এবার সুভাষচন্দ্র বলছেন, 'নিপার প্রকোপ রুখতেও কাজে আসতে পারে প্যাঁচা। প্যাঁচা ও বাদুড় খাদ্যশৃঙ্খলের দুটি অংশ। সুভাষ বলছেন, বাদুড় পলিনেশনে সাহায্য করে। তাই নির্বিচারে বাদুড় নিধন করাও উচিত নয়। তার গবেষণা বলছে, 'প্রকৃতি আমাদের অনেক অস্ত্র দিয়েছে। আমরা তার ব্যবহার ভুলে গিয়েছি। প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে প্যাঁচা বা তার মতো মাংসাশী পাখিরা বাদুড় খেয়ে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। কোভিডের সময় প্যাঁচাদের ভুক্তাবশেষ খুঁটিয়ে দেখে সুভাষ বুঝতে পারেন, তার প্রিয় প্যাঁচারা বাদুড়নিধনে পটু হয়ে উঠছে।'

    নষ্ট বৈচিত্র্য

    বর্ধমান বা তার আশেপাশের অঞ্চলে কাঞ্চননগর থেকে সাইফন জীববৈচিত্র্যে এক সমৃদ্ধ এলাকা ছিল। কিন্তু নাগাড়ে বৃক্ষচ্ছেদন আর শহরের -বেড়ে-চলা এই পরিবেশকে বিপন্ন করছে। তাই সংখ্যায় কমছে প্যাঁচারা। তারা হয়তো এখানে আর তত নিরাপদ বোধ করছে না। তাই চিন্তায় সুভাষচন্দ্র। তবে তার প্যাঁচা কলোনি আর পাখিরালয় আগলেই তিনি অপেক্ষায় বসে। আশা করছেন, পালে পালে ফিরে আসবে প্যাঁচারা।

    প্রাচীন পৃথিবীর প্রাণী

    সুভাষচন্দ্র জানাচ্ছেন, বাদুড় গুহাবাসী জীব। প্রাচীন পৃথিবীর প্রাণী। বিরল জীবাণু বহন করে তারা। 'তাই বাদুড়ের খাওয়া ফল থেকে সতর্ক থাকুন। তবে আতঙ্কিত হবেন না। প্রাকৃতিক প্রতিষেধকগুলিকে বাঁচিয়ে রাখুন।' পরামর্শ তাঁর। প্যাঁচাদের বন্ধু এই  প্রধানশিক্ষক। প্যাঁচারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয়। কথা শোনে। খায়, দায়, বাচ্চা দেয়। তার স্কুলে ছিল  গোটা ত্রিশেক প্যাঁচার সংসার। আগস্ট থেকে এদের প্রজননকাল।

    প্যাঁচা কলোনি এবং বটগাছ

    কাঞ্চননগর এককালে ছুরি কাঁচির জন্য বিখ্যাত ছিল। এখন পেঁচারাই এই অঞ্চলের আকর্ষণ। শুধু প্যাঁচাই নয়, স্কুলের বটগাছকে মাঝে রেখে তৈরি হয়েছে পাখিরালয়। আছে ছাতারে, গোলা পায়রা, শালিখ, চড়ুই। আর আছে কাঠবিড়ালি, মেঠো ইঁদুর, ছুঁচো, বেজি, বাঘরোল, গোসাপ। নানারকম সাপ। আছে একগাদা বাদুড়, চামচিকে। এলাকায় বিশ্বাস, প্যাঁচারা বাদুড় খেয়ে এই এলাকার কোভিড নিয়ন্ত্রণ করেছে। সামাজিক প্রতিষেধক প্যাঁচাদের এই ভূমিকা গবেষণাপত্র ও  বিদেশি সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বাস্তুতন্ত্র হিসেবে একেবারে উপরে থাকে প্যাঁচা। হিংস্র এই নিশাচর মাংশাসী। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় এর গুরুত্ব অসীম, জানাচ্ছেন আদতে বিজ্ঞানের শিক্ষক সুভাষচন্দ্র। জানালেন, একাজ তিনি একা করেন না। আছেন স্কুলের করণিক, চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরাও। আছেন একজন কেয়ারগিভারও। 


    সবচেয়ে বড় কথা, প্রায় ৬০০ ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে এই প্রাণীদের কোনো সংঘাত নেই। শিক্ষার কাজেও লাগছে এই পরিবেশ। প্রধানশিক্ষক জানালেন, এটাই জয়ফুল লার্নিং। আনন্দপাঠ।

    সুভাষচন্দ্র ও রামনাথ 

    শিক্ষকতায় জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন বর্ধমানের ডিএন দাস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সুভাষচন্দ্র দত্ত। ২০১৯ এর শিক্ষক দিবসে দেশের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন।  সুভাষচন্দ্র জানান, তাঁর উদ্ভাবনী পরিকল্পনার কথা শুনে উৎসাহিত করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। বলেন, 'উনি অবাক হয়ে যান আমার উদ্ভাবনী পরিকল্পনা শুনে৷ প্রায় মিনিটখানেক ধরে আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন৷ প্রচুর উৎসাহ দিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন৷ সব বাধা অতিক্রম করে আমাকে এগিয়ে যেতে বলেছেন৷ এটাই আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি৷'

    পরিবেশে ভারসাম্য

    কী ভাবে তাঁর স্কুল অভিনবত্ব দেখাচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের সামনে তুলে ধরেছিলেন সুভাষচন্দ্র। তিনি বলেন, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞানের সঙ্গেই ওঠাবসা। পাখি, কাঠবেড়ালির সঙ্গে কথাবার্তা বলা মানে জীববৈচিত্র্য বজায় রাখা৷ আমার স্কুলে যে লক্ষ্মী পেঁচারা রয়েছে, তারা পরিবেশে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে৷ আমি ক্লাস ফাইভ, সিক্স ও সেভেনের ছাত্রদের দায়িত্ব দিয়েছি, প্রাণী ও  পেঁচাদের দেখভাল করার জন্য৷ ওরাই ক্লাসের একটি পুরোনো বেঞ্চ দিয়ে পেঁচার বাসা বানিয়ে দিয়েছে। এ ভাবেই ছাত্ররা উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী হয়ে পড়ে৷' বলেন সুভাষচন্দ্র।

    বিশ্বাসে আরোগ্য

    সুভাষচন্দ্র দত্ত নিজে একজন ক্যানসার রোগী। নিয়মিত চিকিৎসা চলে তাঁর। তবে রোগকে হারিয়ে খুব উদ্যমী তিনি ও তাঁর সহযোগীরা। এখন ভাল আছেন। তাঁর বিশ্বাস, প্যাঁচাদের সঙ্গই তাঁর এই ভাল থাকার কারণ। কেননা, তিনি বলেন, 'বিশ্বাসে মিলায় আরোগ্য।'

  • Link to this news (২৪ ঘন্টা)