রাজু চক্রবর্তী, কলকাতা: বিধানসভা ভোটের মুখে বঙ্গ বিজেপির নীচুতলায় নয়া বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। সৌজন্যে, বাংলা দখলের লক্ষ্যে মোদি-শাহদের পাঠানো ভিন রাজ্যের ‘বহিরাগত’ নেতৃত্ব। রাতদিন যাঁদের ফাই-ফরমায়েশ খেটে ক্লান্ত বঙ্গ বিজেপির মাঝারি-ছোট পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। এবং তার সঙ্গে ভোট প্রস্তুতির দূর পর্যন্ত সম্পর্ক নেই।এই মুহূর্তে সাংগঠনিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি ১০টি ‘বিভাগে’ বিভক্ত। তার নীচে রয়েছে ৪৩টি সাংগঠনিক জেলা। পরবর্তী পর্যায়ে তা ভেঙেছে মণ্ডল, শক্তিকেন্দ্র ও বুথে। গত ডিসেম্বর মাস থেকে উপরের স্তরে ‘বহিরাগত’ নেতাদের আনাগোনা শুরু হয়ে গিয়েছে। ধাপে ধাপে পরের স্তরগুলি ভিন রাজ্যের গেরুয়া নেতৃত্বের অধীনে চলে যেতে শুরু করেছে। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জেলা নেতৃত্বের হ্যাপা। দক্ষিণবঙ্গের এক জেলা পদাধিকারী বলেন, ‘আমাদের এখানে উত্তর ভারতের এক নেতা এসেছেন। তিনি সম্পূর্ণ নিরামিষ খান। তাঁর জন্য আমাদের এলাকায় প্রথমে বাড়ি ভাড়া খুঁজতে হন্যে হতে হয়েছে। বাস্তুশাস্ত্র মেনে চলা ওই নেতার সাতটি বাড়ি পছন্দ হয়নি। শেষমেশ পছন্দ হয়েছে দক্ষিণ খোলা-পশ্চিম বন্ধ একটি বড়োসড়ো ফ্ল্যাট। এখানেই শেষ নয়। ফ্ল্যাট ঠিক হলেও দেওয়ালের রং তাঁর নাপসন্দ। তাই ওঁর পছন্দের রংও করাতে হয়েছে। পরিচারিকা ও রান্নার লোক নেওয়ার সময় রীতিমতো ইন্টারভিউ হয়েছে। আর তা চলেছে বেশ কয়েকদিন ধরে। ভোটের আগে সংগঠনের কাজ ফেলে আমরা কি সকাল-বিকেল পরিচারিকা খুঁজে বেড়াব?’ রাজ্যের মণ্ডলস্তরের এক কর্মীর কথায়, ‘বিজেপি শাসিত এক রাজ্য নেতার জন্য থালা-বাসন কিনতে গিয়ে সে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। কাঁসার পাত্র ছাড়া তিনি জল বা খাবার মুখে তোলেন না। বাছাই করা সেই বাসনপত্রের ছবি-ভিডিয়ো তুলে, তা পাঠিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হয়েছে।’এখানেই শেষ নয়। ডিসেম্বর থেকে মে—ছ’মাসের ‘মিশনে’ আসা পররাজ্যের নেতাদের জন্য ভাড়ায় এসি, ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ আভেন, ওয়াশিং মেশিন জোগাড় করতে হয়েছে। এবার বাংলায় হাড়কাঁপানো শীত পড়ছে। তাও রাজ্যের বিভিন্ন অংশে কয়েকশো এসি মেশিন বসেছে ভিন রাজ্যের বিজেপি নেতাদের জন্য। এছাড়া ‘বাবুদের’ ভাড়ার গাড়ি, জামা-কাপড় ইস্ত্রি করার লোক ঠিক করতে গিয়ে নাজেহাল বাংলার পদ্ম-নেতারা। এ নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ বঙ্গ বিজেপির নীচুতলা। কমবেশি তাঁদের সবার বক্তব্য, ‘সারা বছর আমরা এলাকায় পার্টির হয়ে কাজ করব। আর ভোটের সময় জুটবে ‘বহিরাগত’ নেতাদের চাকরবৃত্তি? আমরা রাজনীতি করতে এসেছি। বাইরের নেতাদের চাপরাশিগিরি নয়।৮ জানুয়ারি কলকাতায় এসেছিলেন সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডা। সল্টলেকে এক হোটেলে রাজ্য নেতাদের সঙ্গে আয়োজিত দলীয় বৈঠকে তাঁর সামনেই এই জ্বলন্ত ইস্যু তোলা হয়েছিল। তারপরও কেন্দ্রীয় সভাপতির সাফ নির্দেশ ছিল, ভোটের কাজে বঙ্গ বিজেপিকে সাহায্য করতে আরও নেতা আসবে। তাঁদের সবরকম সহযোগিতা করতে হবে। তারপরই এই বিষয়ে চুপ বঙ্গ বিজেপির উপর থেকে নীচুতলা। অসন্তোষের তীব্রতা কিন্তু বাড়ছে। এই আগুনে ঘি ঢালছে ‘টাকার অনিয়ম’ সংক্রান্ত অভিযোগ। কারণ, ভিন রাজ্যের এই নেতাদের আতিথেয়তায় মোটা টাকা বিজেপি দপ্তরে আসছে দিল্লি থেকে। তারপর সেই ফান্ড যাচ্ছে জেলায়। রাজ্য কমিটির এক নেতার কথায়, ‘২০২১ সালের মতো এবারও সেই টাকা এদিক-ওদিক হচ্ছে।’