• সযত্নে আগলে রেখেছেন গ্রামের মানুষ, বাদুড়দের নিয়েই নিত্য ওঠাবসা কুলডিহাবাসীর
    এই সময় | ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
  • সমীর মণ্ডল, মেদিনীপুর

    নিপা ভাইরাস নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অনেকেই আতঙ্কিত। বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ানো এই ভাইরাস নিয়ে চিকিৎসকদের নানা সতর্কবার্তা থাকলেও তা যেন স্পশ করেনি জঙ্গলমহলের এই গ্রামকে। কারণ সেখানে বাদুড়ের সঙ্গেই দশকের পর দশক ঘর করছেন গ্রামের মানুষ।

    পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনির পাখিদের গ্রাম কুলডিহা। বাদুড়ের সঙ্গে এই গ্রামের মানুষের সহাবস্থানের ইতিহাসও বহু পুরনো। দশকের পর দশক ধরে এখানকার বড় বড় গাছ অসংখ্য বাদুড় ও পাখির আশ্রয়। তাদের সযত্নে আগলে রেখেছেন গ্রামের মানুষই। চারপাশে যে নিপা ভাইরাসের কারণে মানুষজন অসুস্থ হচ্ছে তার অন্যতম কারণ যে এই বাদুড় তা জানেন? প্রশ্নের উত্তরে গ্রামবাসীর সরল জবাব, 'ওরা যে আমাদের ঘরের লোক গো। ওদের থেনে কী বিপদ হবে। ও সব নিয়ে ভেবোনি। ওদের জন্যই তো লোকে এই গ্রাম চেনে গো।'

    দেখা গেল, বাদুড়ের লালা রস, মূত্র বা বিষ্ঠা থেকে নিপা ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কার কথা শোনা গেলেও, কুলডিহার বাসিন্দারা মোটেও আতঙ্কিত নন। তাঁদের মতে, বাদুড় ও পাখি এই গ্রামের পরম আত্মীয়। গ্রামের সৌন্দর্য যেমন বাড়িয়েছে, তেমনই দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। তাই বাদুড় মানেই ভয়, এই ধারণা মানতে নারাজ তাঁরা। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা বুদ্ধেশ্বর মাহাতো বলেন, 'আমার ৭৫ বছর বয়স হলো। জন্ম থেকেই এই গ্রামে বাদুড় দেখে আসছি। শুনেছি বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকেও এরা এখানে রয়েছে। আমরা কখনও ওদের জন্য ক্ষতির মুখে পড়িনি। তবে এখন শুনছি বাদুড় থেকে নাকি নানা রোগ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভয় নেই। যতদিন বাঁচব, বাদুড় আর পাখিদের রক্ষা করব।' একই সুর প্রণব মাহাতোর গলায়ও। তিনি বলেন, 'টিভিতে খবরে নিপা ভাইরাসের কথা শুনেছি। কিন্তু আমাদের গ্রামে তার কোনও প্রভাব নেই। মানুষ আর বাদুড় এখানে একসঙ্গেই থাকে।'

    স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা অবশ্য জানাচ্ছেন, বাদুড় থাকলেই যে নিপা ভাইরাস ছড়াবে এমন নয়। তবে সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। সম্প্রতি রাজ্যে একজন ব্রাদার নার্স ও একজন সিস্টার নার্স নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর একাধিক সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বাদুড় বা অন্য প্রাণীর মুখ দেওয়া ফল, খেজুর রস বা খাবার না খাওয়াই ভালো। তা ছাড়া অযথা আতঙ্কিত হয়ে কেউ কেউ হঠাৎ বাদুড় মারতে শুরু করলে সেটাও জীববৈচিত্রের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক। তাই সচেতন ও সতর্ক থাকাই প্রয়োজন।

    জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সৌম্যশঙ্কর ষড়ঙ্গী বলেন, 'বাদুড় থাকলেই আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। তবে যদি কোনও বাদুড় নিপা আক্রান্ত হয়, তখন তার লালারস বা মুত্র থেকে সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। তাই আমরা মানুষকে সচেতন করছি। স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। নিপা মোকাবিলায় আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।"

    বাদুড় মানেই যে আতঙ্ক নয়- 'বাদুড়গ্রাম' কুলডিহা যেন সেই বার্তাই দিচ্ছে।

  • Link to this news (এই সময়)