সন্দীপ প্রামাণিক এবং রণয় তিওয়ারি: সাতসকালে খাস কলকাতায় দিনেদুপুরে খুনের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়াল পর্ণশ্রী থানা এলাকার বেচারাম চ্যাটার্জি রোডে। পর্ণশ্রী থানার অন্তর্গত শক্তি সংঘ ক্লাবের পাশে একটি আবাসনের ২ তলায় পাওনা টাকা নিয়ে বিবাদের জেরে এক বৃদ্ধাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুনের অভিযোগ উঠল তাঁরই প্রাক্তন আয়ার বিরুদ্ধে। নিহত বৃদ্ধার নাম অনিতা ঘোষ (৬৫)। পুলিস অভিযুক্ত আয়া সঞ্জু সরকারকে আটক করেছে।
অনিতা ঘোষের পরিচয়
নিহত বৃদ্ধা দুরদর্শনে গান গাইতেন, অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতেও গান গেয়েছেন, বর্তমানে অনলাইনে গান শেখাতেন। পুলিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অনিতা ঘোষ তাঁর স্বামী অরূপ ঘোষ (৭২) এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান এক সময়ে বেহালা শখের বাজার এলাকায় একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
জানা গিয়েছে, অনিতা ঘোষের স্বামী অরূপ ঘোষ, দূরদর্শনে উঁচু পোস্টে চাকরি করতেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি শয্যাশায়ী, তিনি ডিমেনশেয়ার রোগে আক্রান্ত। কথা বলতে পারেন না। কাউকে চিনতে পারেন না। এমনকি বিছানা থেকেও উঠতে পারেন না। এই দম্পতিকে দেখাশোনার জন্য দুজন আয়া ছিল। একজন সকালে আসতেন এবং আরেকজন রাতে আসতেন। এছাড়াও অপর এক মহিলা রান্না করে দিয়ে যেতেন।
ঘটনার সূত্রপাত
স্থানীয় ও পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, ৩৯৬/৯ বেচারাম চ্যাটার্জি রোডের বাসিন্দা অনিতা ঘোষের স্বামী অরূপ বাবু দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী। তাঁদের ছেলে বেহালার অন্য একটি ফ্ল্যাটে সস্ত্রীক আলাদা থাকেন। অভিযুক্ত সঞ্জু সরকার বছর দুই আগে এই বাড়িতেই আয়ার কাজ করত। সোমবার সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ আচমকাই অনিতা দেবীর বাড়িতে হাজির হয় সঞ্জু।
নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও লুটপাট
পুলিসি জিজ্ঞাসাবাদে ধৃত মহিলা স্বীকার করেছে যে, সে টাকার দাবিতে বৃদ্ধার ওপর চাপ দিচ্ছিল। অনিতা দেবী টাকা দিতে অস্বীকার করলে দু'জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। অভিযোগ, সেই সময় একটি ধারালো ছুরি দিয়ে বৃদ্ধার চিবুক ও পেটে এলোপাথাড়ি কোপ বসায় সঞ্জু। নিজেকে বাঁচাতে বৃদ্ধা বাধা দিলেও শেষরক্ষা হয়নি। বৃদ্ধা রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়লে আলমারি খুলে নগদ টাকা ও সোনার গয়না লুট করতে শুরু করে অভিযুক্ত। নিজেকে বাঁচাতে বৃদ্ধাও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন, যার ফলে অভিযুক্তের শরীরেও কিছু আঘাত লাগে। এক পর্যায়ে বৃদ্ধা অচেতন হয়ে পড়লে অভিযুক্ত মহিলা আলমারি থেকে সোনার গয়না ও নগদ টাকা লুট করেন। খুনের প্রাথমিক অনুমান ডাকাতি।
প্রতিবেশীদের তৎপরতা
এই সময় চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে প্রতিবেশীরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং অভিযুক্ত মহিলাকে ধরে ফেলেন। মহিলার চিৎকার শুনে ছুটে আসেনি প্রতিবেশীরা। ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন তাঁরা।ভিতর থেকে দরজা বন্ধ ছিল। অনেক পরে এক মহিলা দরজা খোলেন এবং তিনি বলেন অনিতা ঘোষকে খুন করে পালিয়ে গিয়েছে এক আয়া। কিন্তু প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয় এই মহিলাই খুন করেছে। তাঁর হাতে রক্তের দাগ ছিল।প্রতিবেশীরা দেখেন, বাথরুমের মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন অনিতা দেবী। তাঁর গলায়, মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
তারাই স্থানীয় থানায় খবর দেন। ধস্তাধস্তির আওয়াজ ও বৃদ্ধার চিৎকার শুনে সন্দেহ হয় প্রতিবেশীদের। তাঁরা দ্রুত ওই বাড়িতে পৌঁছে অভিযুক্ত সঞ্জু সরকারকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। খবর দেওয়া হয় পর্ণশ্রী থানায়। এদিকে অনিতা দেবীর ছেলে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত মাকে উদ্ধার করে বেহালার নারায়ণা হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ছেলে ওঁদের সঙ্গে থাকেন না, মহেশতলায় থাকেন। ছেলেকে প্রথম ফোন করে জানায় দুটো আয়ার মধ্যে একটি আয়া।
পুলিসি পদক্ষেপ
ডিএসপি ও স্থানীয় থানার আধিকারিকরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিস জানিয়েছে, অভিযুক্ত সঞ্জু সরকার নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে। তার শরীরেও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। লুটের উদ্দেশ্যেই এই খুন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো পুরনো আক্রোশ ছিল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিস। ধৃতের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুলিস তদন্তে আরও জানতে পারে যে, পূর্ব বড়িশার বাসিন্দা বৈদ্যনাথ সরকারের স্ত্রী সঞ্জু সরকার (৩৪) এই ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন। পুলিস উক্ত মহিলাকে আটক করে পর্ণশ্রী থানায় নিয়ে যায় এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
অন্যদিকে, স্থানীয় থানার একটি দল হাসপাতালে পৌঁছালে জানতে পারে যে, বৃদ্ধাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকরা ঘোষণা করেছেন।