নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: বারবার নিয়ম বদল। নথি নিয়ে নিত্যনতুন ফতোয়া। অসংগতির ধুয়ো তুলে আম জনতার হয়রানি। ‘অপরীক্ষিত’ এআই সফটওয়্যারের গেরোয় প্রায় দেড় কোটি মানুষকে শুনানিতে ডাক। এসআইআর এখন পশ্চিমবঙ্গের আতঙ্ক সমগ্র। নেপথ্যে ‘তুঘলকি’ নির্বাচন কমিশন। গোটা দেশের নির্বাচনি বিধি নির্ধারণে এই একচ্ছত্র আধিপত্য মানুষের হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ালে সুপ্রিম কোর্ট যে মেনে নেবে না, তার প্রমাণ মিলল সোমবার। তীব্র সমালোচনার কাঠগড়ায় কমিশনকে তুলে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী তোপ দাগলেন, ‘সামান্য ভুল শোধরানোর নামে যেভাবে সাধারণ মানুষকে মানসিক চাপ দিচ্ছেন, তা মোটেই বরদাস্ত করা যায় না।’ সহমত পোষণ করলেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত। সেই চাপে বাংলার এসআইআর ইস্যুতে কমিশনকে মানতে হল একগুচ্ছ নির্দেশ। কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী আপত্তি তুলেও ঠেকাতে পারলেন না।শীর্ষ আদালত আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, এতটুকু অনিয়ম দেখলেও গোটা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করে দেওয়া হবে। তা সত্ত্বেও আম জনতার হয়রানিতে খামতি হয়নি। তার প্রতিবাদ জানিয়েই তৃণমূলের পক্ষে মামলা করেছিলেন মোস্তারি বানু, দোলা সেন এবং ডেরেক ও’ব্রায়েন। তার শুনানি ছিল এদিন। আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করেন কপিল সিবাল ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের সিংহভাগ দাবি মেনেই নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সিবাল সওয়াল করেন, ‘সামান্য অসংগতির জন্য লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে বাংলার ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। দেগে দেওয়া হয়েছে সন্দেহজনক বলে। এটা অযৌক্তিক।’ কমিশনের আইনজীবীর পালটা প্রশ্ন ছিল, ‘কেনই বা ডাকা হবে না? ২৩৪ জনকে পাওয়া গিয়েছে, যাঁদের বাবার নাম এক। আবার সাতজনের সন্তান ১০০ জন করে। এই অসংগতি শোধরাতেই হবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে ভোটারের বয়সের ফারাক মাত্র ১৫ বছর, কিংবা ঠাকুরদার সঙ্গে মাত্র ৪০ বছর? কীভাবে হয়?’ এই সওয়াল শুনে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বিস্ময়ের সঙ্গে কমিশনকে প্রশ্ন করেন, ‘এগুলোর জন্য কাউকে নোটিস পাঠানো যায়? আমাদের দেশে কি বাল্যবিবাহ হয়নি?’ কমিশনের কোনও যুক্তিই আদালতের দরবারে টিকতে পারেনি। সওয়াল-জবাব শুনে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, ১) লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারের নামের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। টাঙাতে হবে ব্লক, পঞ্চায়েত ভবন এবং পুর-ওয়ার্ডে। ২) তালিকা প্রকাশের ১০ দিন পর পর্যন্ত শুনানিতে হাজির হতে পারবেন ভোটাররা। ৩) খসড়া তালিকায় নাম থাকা বৈধ ভোটার শুনানিতে প্রতিনিধি নিয়ে যেতে পারবেন। সেই প্রতিনিধি রাজনৈতিক দলের বুথস্তরের এজেন্ট (বিএলএ) হতেই পারেন। ৪) নথি জমা নেওয়ার পর ভোটারকে তার রসিদ দেবে কমিশন। ৫) বয়সের প্রমাণ হিসাবে শংসাপত্রের পাশাপাশি মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডও গ্রহণযোগ্য। ৬) হোয়াটসঅ্যাপে নয়। প্রকৃত সার্কুলার জারি করেই নিয়ম বদলানোর কথা জানাতে হবে। ৭) বাড়াতে হবে হিয়ারিংয়ের কেন্দ্রও। অন্যদিকে রাজ্য সরকারের উদ্দেশে কোর্টের নির্দেশ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে হবে। প্রক্রিয়া যেন মসৃণভাবে চলে।২৩ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী শুনানি। প্রধান বিচারপতি কিন্তু এদিন বলেছেন, ‘মামলা শেষ করছি না। প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের দরজা খোলা। কোনও সমস্যা হলেই আসতে পারেন।’