সুকান্ত বসু, কলকাতা: ‘এ দেবী আর ওই দেবী কি একই? দু’জনেই কি সরস্বতী?’ দেড় ফুটের আর ছ’ফুটের দু’টি সরস্বতী মূর্তি পাশাপাশি রাখা। তা দেখে ভেসে এল প্রশ্ন। অন্য কেউ হলে মৃৎশিল্পী মারতে উঠতেন। ‘মস্করা নাকি? সরস্বতী চেনো না। মুর্খ তুমি?’ কিন্তু প্রশ্নকর্তা যেহেতু বিদেশি। এবং প্রশ্নটা ইংরেজিতে করেছেন। তাই শোনার পর শিল্পী কিছু বললেন না। গাইডের মাধ্যমে বাংলায় বুঝিয়ে দিলেন, সরস্বতীর কল্পরূপ।এই বিদেশির শুধু নয়, সোমবার কুমোরটুলিতে এরকম হাজার প্রশ্নের উত্তর দিতে হল শিল্পীদের। কারণ সোমবার বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন বিদেশি এসেছিলেন কুমোরপাড়ায়। মৃৎশিল্পীদের বক্তব্য, দুর্গাপুজোর সময়ও বিদেশের নাগরিকদের এরকম আগমন দেখা যায়নি। সরস্বতী বিদ্যার দেবী বলেই কি এত আগ্রহ বিদেশের নাগরিকদের? ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ডেনমার্ক, মালয়েশিয়া থেকে পর্যটকরা এসেছিলেন কুমোরটুলিতে ঠাকুর দেখতে। ‘এত বড়ো!’ ‘এত কালার!’ ‘এতরকম দেখতে মডেল!’ ‘এত সুন্দর!’ ‘ওয়াও!’ নাইস!’ ‘এক্সেলেন্ট!’ নিজেদের ভাষায় এইসব বিস্ময়সূচক উক্তি করছেন আর মুগ্ধ হচ্ছেন প্রতিপদে। ঘুরছেন কুমোরটুলির অলিগলি। খিদে পেলে খাচ্ছেন, বাংলার লেবুমাখা ভুট্টাপোড়া। কেউ কেউ স্বাস্থ্যের খেয়াল না করেই খেয়ে চলেছেন, তেলে ভাজা-রাস্তার ধুলো মাখা পকোড়া। সেই খেয়েও ‘গুড গুড,’ ‘ভেরি গুড,’ ‘ভেরি টেস্টি,’ এসব করছেন। আর দামি দামি ক্যামেরায় কিংবা নামকরা সংস্থার মোবাইলে তুলে গিয়েছেন ছবি, ভিডিও। সেলফিও কম তোলেননি। দু’জন তরুণী, ‘পিটিসি’(পিস টু ক্যামেরা) করলেন। হয়ত তাঁরা ইউটিউবার। সবমিলিয়ে কুমোরটুলিতে সোমবার যেন কার্নিভাল!সরস্বতী পুজো যতই এগিয়ে আসছে, কুমোরটুলিজুড়ে ব্যস্ততা বেড়েই চলেছে। মৃৎশিল্পীদের নাওয়া‑খাওয়ার ঠিক নেই। এদিন দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন শিল্পীর ঘরে তৈরি হচ্ছে ছোট থেকে ঢাউস আকারের সরস্বতী। অনেক প্রতিমা তৈরি হয়ে ডেলিভারি করা হচ্ছে। কুলিরা নিয়ে যাচ্ছেন। অধিকাংশই যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কুমোরটুলি স্ট্রিট, বনমালী সরকার স্ট্রিট, রবীন্দ্র সরণি সহ পটুড়াপাড়ার বিভিন্ন চত্বরে দিনভর এমনই ছবি। শিল্পী রাজা পালের স্টুডিও থেকে পাঁচ ফুট লম্বা টানা চোখের সরস্বতী কিনলেন এপিসি রোডের একটি কোচিং সেন্টারের দুই শিক্ষক। সুজিত কর্মকার ও তপন কাপাস নামে ওই দুই শিক্ষক বলেন, ‘গতবছরের তুলনায় এবার প্রতিমার দাম অনেকটাই বেশি। এবার কুলির ভাড়াও একটু বেশি। কিন্তু কী করা যাবে?’ শিল্পী সমর পাল বললেন, ‘প্রতিমার দাম বাড়লেও গতবছরের তুলনায় অর্ডার কমেনি। আরও ২০‑২২টি অতিরিক্ত করতে হয়েছে।’ শিল্পী চায়না পালের ঘরেও জমজমাট ভিড়। সেখানে ক্রেতা পাইকপাড়ার গোধূলি ভট্টাচার্য বলেন, ‘কুমোরটুলির প্রতিমা মানেই আবেগ। তাই প্রতিবছর এখান থেকেই সরস্বতী কিনতে হয়।’শুক্রবার সরস্বতী পুজো। তার আগে ক্রেতাদের ভিড়। তবে সে ভিড়কে লম্বা পায়ে হেঁটে হারিয়ে দিয়েছেন সাড়ে ছ’ফুট লম্বা সাহেব। ফটো তুলে প্রায় রেকর্ড করে ফেলেছেন পঞ্চাশ বছরের দুধেআলতা রঙের প্রৌঢ়া। সেলফি তুলে মোবাইলের ব্যাটারি প্রায় শেষ করে ফেলেছেন কুড়ি বছরের গ্রিক দেবীর মতো দেখতে তরুণী। সরস্বতী বিদ্যার দেবী বলেই কি কুমোরটুলিতে বিদেশিদের এত ভিড়? প্রশ্নের উত্তর দেবেন দেবী। তিনি আসছেন শুক্রবার।