বামেদের কারণে এসআইআর-এর ফাঁসে আটকে গিয়েছে বাংলাদেশ থেকে আসা বহু শরণার্থী হিন্দু পরিবার
দৈনিক স্টেটসম্যান | ২১ জানুয়ারি ২০২৬
এসআইআর ঘিরে ফের তোলপাড় গোটা বাংলা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বাংলাদেশ থেকে আসা ছিন্নমূল হিন্দু পরিবারগুলির মধ্যে। চার-পাঁচ দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাস করা এই পরিবারগুলির অনেকেই বছরের পর বছর ভোট দিয়ে এসেছেন। ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও এসআইআর-এর জেরে তাঁদের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা।
বাস্তব চিত্র বলছে, বাংলাদেশে ধারাবাহিক নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে সত্তর ও আশির দশকে অসংখ্য হিন্দু পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়। এঁদের অধিকাংশ পরিবার রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় চাষের ফাঁকা জমি কিনে নিজেদের হাতে তাঁরা ঘর তুলেছিলেন। সেই ঘরের পাশে লাগানো চারাগাছ আজ ফলন্ত বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর নিয়ম করে স্থানীয় তহশিল দপ্তরে গিয়ে জমির খাজনা দিয়েছেন তাঁরা। বাড়ির কর্তা-কর্ত্রীর চুল পেকে গিয়েছে, সন্তানরা বড় হয়েছেন, তাঁরাও সংসার পেতেছেন, নাতি-নাতনিও এসেছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়েও বহু পরিবারের কর্তা-কর্ত্রীর নাম ভোটার তালিকায় ওঠেনি। কোথাও আবার পুত্রবধূর নাম ভোটার তালিকায় থাকলেও শরণার্থী শ্বশুর-শাশুড়ির নাম নেই। এমনকি বাবা-মায়ের নাম না থাকার কারণে স্কুল-কলেজের শংসাপত্র থাকা সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে তাঁদের ছেলেদের নামও ভোটার তালিকায় ওঠেনি।
এই দীর্ঘ বঞ্চনার নেপথ্যে রাজনৈতিক বাস্তবতার অভিযোগ নতুন নয়। ১৯৭৭ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর বামফ্রন্ট সরকার বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তু হিন্দুদের একটি বড় অংশকে নাগরিক স্বীকৃতি ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পথে কার্যত বাধা সৃষ্টি করতে থাকে বলে অভিযোগ। শরণার্থী মহলের দাবি, রাজনৈতিক আশঙ্কাই ছিল মূল কারণ। বামফ্রন্টের মনে হয়েছিল, নাগরিকত্ব পেলে এই উদ্বাস্তুরা তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন। ফলে দশকের পর দশক ধরে ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করে শুনানিতে হাজির হলেও নানা কৌশলে তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় তুলতে দেওয়া হয়নি।
এর ফল ভোগ করতে হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত হলেও নাগরিকত্বের জটিলতায় চাকরি পেতে বহু ক্ষেত্রে দেরি হয়েছে তাঁদের ছেলেমেয়েদের। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির দৌড়ে অনেক পরিবার কার্যত এক প্রজন্ম পিছিয়ে পড়েছে। শরণার্থী মহলের অভিযোগ, বামপন্থীদের এই ঘৃণ্য রাজনীতির শিকার হয়ে স্বাভাবিক নাগরিক জীবন থেকেও বঞ্চিত থাকতে হয়েছে তাঁদের।
রাজনৈতিক ইতিহাসেও এই বিষয়টি বিতর্কের কেন্দ্রে। এক সময়ে কংগ্রেসকে পরাস্ত করতে বামফ্রন্টের সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির সখ্যতার কথাও রাজনৈতিক মহলে চর্চিত হয়েছে। ব্রিগেডের সর্বদলীয় সভায় জ্যোতি বসু ও বাজপেয়িকে একই মঞ্চে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সমীকরণ ভেঙে যায়। কারণ হিসেবে উঠে আসে, বাংলাদেশ থেকে আসা নিপীড়িত হিন্দুদের ভোটে পঞ্চায়েত স্তরে ভারতীয় জনতা পার্টিকে সমর্থন। বামফ্রন্ট বুঝেছিল, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পশ্চিমবঙ্গে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বই বিপন্ন হতে পারে।
৩৪ বছর পর রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল জমানায় বহু উদ্বাস্তু পরিবার কিছুটা স্বস্তি পান। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ওপার থেকে ছিন্নমূল হয়ে আসা বহু মানুষ নাগরিকত্বও অর্জন করেন। কিন্তু সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি। বাম আমলে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকার কারণে এসআইআর-এর আওতায় পড়ে ফের হয়রানির মুখে পড়ছেন বহু পরিবার। যাঁরা ভেবেছিলেন দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান হয়েছে, তাঁদের কাছেই আজ প্রশ্ন— এত বছরের বসবাস, সামাজিক শিকড় আর ভোটাধিকার কি তবে আবার প্রশ্নের মুখে পড়তে চলেছে?
রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই এসআইআর নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে বাংলার উদ্বাস্তু জীবনের পুরনো ক্ষত। আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলির একটাই দাবি— দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত নাগরিক জীবন ও ভোটাধিকার নিয়ে যেন আর কোনও প্রশ্নচিহ্ন না ওঠে।