• সুপ্রিম-নির্দেশ সত্ত্বেও কমিশন ধন্দেই, দুর্ভোগে ভোটাররা
    এই সময় | ২১ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) নিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দূর করতে সোমবার একগুচ্ছ নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির তালিকা প্রকাশ থেকে শুরু করে শুনানিতে বুথ লেভেল এজেন্টদের (বিএলএ–২) সাহায্য নেওয়ার অনুমতি— কমিশনকে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে বলেছে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। কিন্তু সুপ্রিম–নির্দেশ কার্যকর করতে তৎপরতা চোখে পড়েনি ২৪ ঘণ্টা পরেও। এমনকী, কী ভাবে সেই নির্দেশ কার্যকর করা যাবে, কত দিনে শুনানি শেষ হবে— তা নিয়ে ধোঁয়াশায় কমিশন ও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দপ্তরও। ভোটারদের যে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তির মধ্যে কাটাতে হচ্ছি‍ল, মঙ্গলবারও তাতে ইতি পড়ল ন‍া। যার ফলশ্রুতিতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, ভাঙচুরও অব্যাহত রইল।

    রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং জেলাশাসক–পুলিশ সুপারদের ‘সার’ চলাকালীন আইন–শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। এ দিনও যে ভাবে বিক্ষোভ–ভাঙচুর হয়েছে শুনানি কেন্দ্রে, তাতে পুলিশ–প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।সুপ্রিম–নির্দেশ মতো কবে প্রকাশিত হবে ‘অসঙ্গতি’র তালিকা? কবেই বা এই তালিকায় থাকা ভোটারদের শুনানি হবে? কী ভাবে ভোটারদের সমস্যার সুরাহা করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে?

    রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, যে হেতু মঙ্গলবার সন্ধেয় সুপ্রিম–নির্দেশ ওয়েবসাইটে আপলোড হয়েছে, তাই সেটা খতিয়ে দেখে তিন দিনের মধ্যে তালিকা আপলোড করতে হবে। অর্থাৎ, সেটা হতেও শুক্রবার গড়িয়ে যাবে। তার পরে ভোটারদের ১০ দিন সময় দিতে হবে নথি জমা দেওয়ার জন্য। সেটা খতিয়ে দেখে হিয়ারিংয়ের নোটিস পাঠানো হবে ভোটারদের। তা হলে ২ ফেব্রুয়ারির আগে ফের শুনানি শুরু হবে না। প্রশ্ন হলো, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকায় থাকা যে ভোটারদের ইতিমধ্যে শুনানির নোটিস দেওয়া হয়েছে অথবা শুনানি হয়ে গিয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে কী হবে? আগামী কয়েকদিন যে সব ভোটারের শুনানি হওয়ার কথা, সেই শুনানিও কি স্থগিত রাখা হবে?

    মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে ভোটারের বয়সের প্রমাণপত্র হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছে শীর্ষ আদালত। কিন্তু এটা নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র হিসেবে গ্রহণ করা যাবে কি না, নথি জমা নিয়ে কী রসিদ দেওয়া হবে, সে সব নিয়েও অন্ধকারে কমিশনের কর্তারা। একই ভাবে সব দলের বিএ‍লএ–২দের হিয়ারিংয়ে রাখতে হলে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষা হবে কী করে, সেটাও ভাবাচ্ছে কমিশনকে। তবে এই সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি না–হলেও এ দিন নতুন করে রাজ্যে ১৪ জন স্পেশাল অবজ়ার্ভার পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এ নিয়ে রাজ্যে মোট অবজ়ার্ভারের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৮। কিন্তু তাতে কি শুনানির বাকি পর্বটা নির্ঝঞ্ঝাট হবে? সদুত্তর মেলেনি।

    বস্তুত সুপ্রিম–নির্দেশের ২৪ ঘণ্টা পরেও এই সব প্রশ্নের সদুত্তর না–মেলায় ভোটারদের দুর্ভোগ ও প্রতিবাদ মঙ্গলবার সমান তালে চলেছে। দিন কয়েক আগে ‘সার’–এর শুনানিকে কেন্দ্র করে গোলমালে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়ায় বিডিও অফিসে। এ দিন প্রায় তেমনই ছবি ধরা পড়ল দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী ও উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালিতে। দুই জায়গাতেই শুনানি ঘিরে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হচ্ছে, এই অভিযোগে ব্যাপক ভাঙচুর চলে শুনানি কেন্দ্রে। বাসন্তীতে বিডিও অফিস সংলগ্ন কর্মতীর্থ বিল্ডিংয়ে শুনানি চলছিল। প্রবল ভিড়ে সাধারণ ভোটারদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, এই অভিযোগেই প্রথমে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রতিবাদে বিডিও অফিসের কাছে সোনাখালিতে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করা হয়। এর মধ্যে আবার রামচন্দ্রখালি গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলের প্রধান হায়দার গাজি ঘটনাস্থলে পৌঁছলে তাঁর সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন আন্দোলনকারীদের কয়েকজন। শুরু হয়ে যায় হাতাহাতি। একদল বিক্ষোভকারী হিয়ারিং সেন্টারে ভাঙচুর চালান।

    সন্দেশখালিতেও হিয়ারিংয়ের নামে সাধারণ মানুষের হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর হয় বিডিও অফিসে। মঙ্গলবার দপুরে সন্দেশখালি–১ ব্লকের হাটগাছি পঞ্চায়েতের ৫৩ ও ৫৭ নম্বর পার্টের শুনানি চলছিল। সেখানে বৈধ নাগরিকদের নানা প্রমাণপত্র দাখিল করতে বলা হয়েছে, এই অভিযোগ ঘিরে গোলমাল শুরু হয় কমিশনের আধিকারিকদের সঙ্গে। আবার নথি জমা করলেও কোনও রিসিপ্ট দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠে। এর জেরে গোলমাল চলাকালীন বিডিও অফিসের কনফারেন্স রুমের কম্পিউটার, চেয়ার, টেবিল, জানলার কাচ ভাঙা হয়। একই অভিযোগে উত্তেজনা ছড়ায় বারাসত–১ ব্লকেও। শুনানি কেন্দ্রে বিরোধী রাজনৈতিক দলের এজেন্টদের বসতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধে যায় সিপিএম সমর্থকদের।

    কমিশন সূত্রের খবর, বাসন্তীতে শুনানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে রাজ্য পুলিশের নোডাল অফিসার আনন্দ কুমারের সঙ্গে কথা বলেন সিইও মনোজ আগরওয়াল। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের কাছ থেকে রিপোর্টও চাওয়া হয়েছে। সিইও অবশ্য গোটা বিষয়টির দায়িত্ব রাজ্যের উপরেই ছাড়ছেন। তাঁর কথায়, ‘আইন–শৃঙ্খলা রাজ্যের বিষয়। রাজ্য পুলিশকেই গোটা বিষয়টি দেখতে হবে।’ গোলমালের খবর এ দিন বিকেল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের তরফে না–আসাতেও ক্ষুব্ধ তিনি। অন্য দিকে, রাজ্য প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকরে এখনও কমিশনের সদিচ্ছা দেখা যায়নি। তবে কোথাও কোনও গোলমালের খবর পেলেই পুলিশ–প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে।’

    বারাসত পুরসভার–১ নম্বর ওয়ার্ডের কাজিপাড়া এলাকায় মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাস বেশি। সেখানকার মোট ১০ হাজার ভোটারের মধ্যে চার হাজারের বেশি ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ। কমিশনের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ তুলে এ দিন সংখ্যালঘু কয়েকশো মানুষ বারাসতের গেঞ্জি মিল সংলগ্ন যশোর রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু দেখান। যশোর রোডের দু’ধারে গাড়ির লম্বা লাইন পড়ে যায়। চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।

    রাজ্যের শাসক–বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও এ নিয়ে পরস্পরের উপরে দায় চাপিয়ে দিয়েছে। তৃণমূল মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেওয়ার ২৪ ঘণ্টা পরেও কমিশনের কোনও হেলদোল নেই। শুনানিতে ডাকা ভোটারদের তা‍লিকা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। এখনও বিএলএ–দের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না শুনানি কেন্দ্রে। অনেক জায়গায় রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। বিজেপি আর নির্বাচন কমিশনের তুঘলকি আচরণের জন্য এই ঘটনা ঘটছে।’ পাল্টা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের অভিযোগ, ‘তৃণমূল চাইছে সার প্রক্রিয়া ভেস্তে দিতে। তাই বিভিন্ন হিয়ারিং কেন্দ্রে গিয়ে তারা গন্ডগোল পাকাচ্ছে। পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে। নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক আটুট রাখতেই রাজ্যের শাসকদল এই কৌশল নিয়েছে।’

  • Link to this news (এই সময়)