হয়রানির জন্য শুভেন্দুর তোপ রাজ্যকেই, কমিশনে বিক্ষোভ কংগ্রেসের
আনন্দবাজার | ২১ জানুয়ারি ২০২৬
বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) করে ভোটার তালিকা থেকে রোহিঙ্গা ও অনুপ্রবেশকারীদের বার করা হচ্ছে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে হিন্দু বাঙালি-সহ অন্যান্য মানুষকেও কিছু হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে মন্তব্য করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর। তবে তাঁর অভিযোগ, এই পরিস্থিতির দায় রাজ্য সরকারকেই নিতে হবে। শুভেন্দুর মন্তব্যের পাল্টা সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসও। পাশাপাশি, ষুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির (‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’) নামে শুনানিতে ডেকে সাধারণ মানুষের হয়রানির প্রতিবাদে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের সামনে কংগ্রেসের বিক্ষোভে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রাত পর্যন্ত লালবাজারের লক-আপে কাটিয়ে মুক্তি পেয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতা-কর্মীরা। বিজেপি ও কমিশনের জন্য মানুষের হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তৃণমূল সরকারের পুলিশের হাতে হয়রান হতে হবে কেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস নেতারা।
নদিয়ার ধুবুলিয়ায় মঙ্গলবার ‘পরিবর্তন সঙ্কল্প সভা’য় গিয়ে শুভেন্দু বলেছেন, “প্রায় এক বছর আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন এসআইআর-এর জন্য রাজ্য সরকারের কাছে এক হাজার ডেটা এন্ট্রি অপারেটর চেয়েছিল। বিহার-সহ বিভিন্ন রাজ্য অপারেটর দিয়ে সাহায্য করলেও এই রাজ্য সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তা দেয়নি। সামান্য কিছু টাকা খরচ তারা এই কাজের জন্য করতে চায়নি। তারই পরিণতিতে আজ সাধারণ মানুষকে ছোটখাটো ভুলের জন্য হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে।”
বিরোধী নেতার বক্তব্যের জবাবে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেছেন, ‘‘অসম থেকে এ রাজ্যের রাজবংশী, মতুয়াদের নোটিস পাঠাচ্ছে কোন এআই-এর কারণে? আসলে নাম বাদের চক্রান্ত ধরা পড়ে যাওয়ায় বিজেপি নেতারা এখন দিশাহারা।’’ তাঁর দাবি, ‘‘গত তিন মাস ধরে শুভেন্দুরা যে লাখ লাখ রোহিঙ্গার কথা বলে বেড়িয়েছেন, কমিশনের বাদের তালিকায় তাঁদের এক জনকে দেখাতে পারবেন? না পারলে বাংলার মানুষের কাছে ক্ষমা চান।’’ আর সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘নির্ভুল ভোটার তালিকার দাবি আমাদের ছিল। কিন্তু ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র নামে অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে অজস্র মানুষকে হয়রানির মুখে ফেলেছে নির্বাচন কমিশন। যে তৃণমূল সরকার বাঁচানোর রাস্তা খুঁজছিল, নেপথ্যে বিজেপির মদতে এই সব কাজকর্ম আসলে সেই তৃণমূলকে অক্সিজেন জুগিয়ে দিল!’’
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক আদেশের পর গোটা পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও করণীয় স্থির করতে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠক আগামী ২২শে জানুয়ারির বদলে ২৪শে হতে চলেছে। ভোটের সঙ্গে যুক্ত দলের প্রায় এক লক্ষ নেতা-কর্মী ওই ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নেবেন বলে দলীয় সূত্রে খবর।
শুনানি-পর্বে হয়রানি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গোটা প্রক্রিয়া চলছে, এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ দিন কংগ্রেসের সিইও দফতর অভিযানে ধুন্ধুমার বেধেছিল। গ্রেফতার করা হয় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার-সহ দলের এক ঝাঁক নেতা-কর্মীদের। প্রদেশ কংগ্রেসের ডাকে এ দিন নেতা-কর্মীরা মিছিল করে সিইও দফতরের সামনে পৌঁছনোর কিছুটা আগেই ব্যারিকেড দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করে পুলিশ। দু’পক্ষে ব্যাপক ধস্তাধস্তি বাধে। বাধা পেয়ে সেখানেই অবস্থানে বসেন কংগ্রেস নেতারা। পরে তাঁদের লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। দলের পক্ষ থেকে কমিশনের উদ্দেশে খোলা চিঠি লিখে শুনানি-হয়রানি বন্ধের দাবি তোলা হয়েছে। বিভিন্ন অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করে কমিশনের উদ্দেশে প্রদেশ সভাপতির বক্তব্য, “সুপ্রিম কোর্ট ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’ (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) সংক্রান্ত বিষয়ে শুনানিতে কয়েকটি পরিবর্তন আনার কথা বললেও, তা বাস্তবায়িত হয়নি। যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির ভিত্তিতে জারি করা নোটিসের শুনানি স্থগিত, সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা, শুনানিতে উপস্থিত সকল ভোটারকে শুনানির ফলাফল অবহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে হবে।” কংগ্রেসের তরফে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনা করার জন্য বিএলও-র কাজ থেকে শিক্ষকদের অব্যাহতি দেওয়ার দাবিও তোলা হয়েছে।
এসআইআর-আতঙ্কে মৃত্যু হয়েছে, এমন কয়েক জনের পরিবারের লোকজনকে এনে এ দিন সরব হয়েছে নাগরিক সংগঠন ‘দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ’। সেখানে এসে পানিহাটিতে মৃত প্রদীপ করের ভাগ্নি শিল্পী ওঝা বলেছেন, “এসআইআর-এর ঘোষণা থেকেই মামা খুবই চিন্তিত ছিলেন। পরের দিনেই সকালে তাঁর দেহ উদ্ধার হল।” অপমৃত্যু হয়েছিল মুকুন্দপুরের বুথ লেভল অফিসার (বিএলও) অশোক দাসের। তাঁর স্ত্রী সুদীপ্তারও অভিযোগ, “উনি বলেছিলেন, চাপ নিতে পারছেন না। কাজ শেষ করার সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করেও লাভ হয়নি।” ছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু, ভিভান ঘোষ, সৈকত মিত্র প্রমুখ।