• নিচুস্তরের মানুষের গল্প বললে গালমন্দ, যৌনতা থাকবেই! অহেতুক আমিও পছন্দ করি না: অনির্বাণ
    আনন্দবাজার | ২১ জানুয়ারি ২০২৬
  • ছবির মাথা-মুখ জুড়ে আড়াআড়ি বীভৎস কাটা দাগ! তুবড়ির মতো গালমন্দ ছুটছে। চরিত্রাভিনেতা জনসমক্ষে নিপাট ‘ভদ্রলোক’। অন্তরে কি এ রকমই? অনির্বাণ চক্রবর্তী আদতে কেমন?

    প্রশ্ন: অনির্বাণকে দেখলেই নাকি ‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার’ পঙ্‌ক্তি শোনা যাচ্ছে?

    অনির্বাণ: (হেসে ফেলে) তা একটু শোনা যাচ্ছে। আমিও শুনতে পাচ্ছি।

    প্রশ্ন: শীতে যিনি ফেলুদার সহকারী, বসন্তে তিনিই অন্ধকার দুনিয়ার বাসিন্দা!

    অনির্বাণ: হ্যাঁ, একদম ভিন্ন স্বাদের চরিত্র। অন্য ধরনের লুক। অভিরূপ ঘোষ সেই পরিচালকদের মধ্যে একজন, যিনি আমায় নিয়ে পরীক্ষা করার সাহস দেখান। বাংলা জি ৫-এ ওঁর ‘কালীপটকা’ সিরিজ়ে আমি ‘রানা’। অপরাধদুনিয়ার মানুষ।

    প্রশ্ন: যেখানে চার নারীর গল্প, সেখানে অনির্বাণ রাজি হলেন?

    অনির্বাণ: কেন রাজি হব না! মহিলাকেন্দ্রিক সিরিজ়ে সমাজের যে স্তরের গল্প দেখানো হবে, সেই গল্প খুব কমই দেখানো হয়। এমনকি আমিও ওই চার নারীর মতোই বস্তিবাসী। এই ধরনের জীবন আমার দেখা নেই। এগুলোর পাশাপাশি আরও কারণ আছে। কোনও কাজ বাছার আগে অবশ্যই আমার চরিত্র বা আমার সঙ্গে কারা অভিনয় করছেন— জানতে চাই। কিন্তু আমার চরিত্র বড় না ছোট— সেটা কিন্তু দেখি না। তা হলে অনেক কাজ করা হত না। যেমন, এমন ছবিতেও অভিনয় করেছি, যেখানে হয়তো আমার তিনটি কি চারটি দৃশ্য। খুশিমনেই করেছি সেই ছবি। কারণ, যে মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছি, সেই মানুষটিকে আমার চেনা ছিল না। এখানেও সেটাই ঘটেছে। অভিনয় করতে গিয়ে বস্তিবাসী ‘রানা’কে চিনেছি। তার মন বুঝতে চেষ্টা করেছি। এই ধরনের চরিত্র আগে করিনি। তাই রাজি হওয়াই স্বাভাবিক। আর চার নারীকে নিয়ে গল্প এগোলেও আমার চরিত্রটিও যথেষ্ট শক্তিশালী। খুব যত্ন নিয়ে লেখা।

    প্রশ্ন: মাথা-মুখ জুড়ে আড়াআড়ি বীভৎস কাটা দাগ! রিভলভার হাতে আপনি...

    অনির্বাণ: জেলখাটা আসামি রানা। নানা জটিলতায় ভরা জীবন। আর পাঁচজনের সঙ্গে ঠিক মেলে না।

    প্রশ্ন: এই সাজে নিজেকে দেখে চমকে গিয়েছিলেন?

    অনির্বাণ: হ্যাঁ, তা হয়েছি। কারণ, আমি যেমন, চরিত্রটি তো সে রকম নয়! এই সাজেও তাই প্রথম। বরাবর ভদ্র-শিক্ষিত ‘লুক’ আমার। মাথা-মুখ জুড়ে গভীর ক্ষত তৈরি হলে সাধারণত চোখও নষ্ট হয়। আমার চোখের মণির রং তাই পাল্টে দেওয়া হয়েছে। তিন বার আমার পোশাক বদলানো হয়েছে। অজপা মুখোপাধ্যায় আর অভিরূপ খুব যত্ন নিয়ে তৈরি করেছেন।

    প্রশ্ন: টলিউড বলে, অনির্বাণ প্রস্তুতি ছাড়াই যে কোনও ‘চরিত্র’ হয়ে উঠতে পারেন। ‘রানা’কে ফুটিয়ে তোলাও এত সহজ ছিল?

    অনির্বাণ: অ্যাকশন দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য ‘ফিটনেস’ থাকা জরুরি। তার জন্য সারা বছর হালকা শরীরচর্চা করতে হয়। সেটা করি। তার পর চিত্রনাট্য পড়ে চরিত্রের মন বোঝার চেষ্টা করি, সেটা ‘রানা’র ক্ষেত্রেও করেছি। ওটা বুঝলে চরিত্র হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগে না। আলাদা করে হাঁটা, চলা, কথা বলার অভ্যাস করতে হয় না। আমি যখন ক্যামেরার সামনে হাঁটলাম, দেখলাম হাঁটা বদলে গিয়েছে। কেবল কণ্ঠস্বর বদলে ফেলেছিলাম। চরিত্রের সঙ্গে মানানসই কণ্ঠস্বরে ডাবিং করেছি। চরিত্রের সঙ্গে আমার এই ‘যাপন’ কিন্তু পোস্ট প্রোডাকশন পর্যন্ত চলে।

    প্রশ্ন: ‘রানা’র মন না হয় অনির্বাণ পড়লেন। অনির্বাণের মন?

    অনির্বাণ: খুব গভীর প্রশ্ন। এত দিন পর্যন্ত যত চরিত্রে অভিনয় করেছি, তার কোনটা খুব ভাল। কোনও খুব খারাপ। অবশ্যই তার সঙ্গে আমার মেলে না। আবার প্রত্যেকটার মধ্যেই একটু হলেও অনির্বাণ চক্রবর্তী আছে। হ্যাঁ, খারাপ চরিত্রের মধ্যেও থাকি আমি!

    প্রশ্ন: অনির্বাণের মধ্যেও মন্দ লোকের বাস!

    অনির্বাণ: দেখুন, আমার শিক্ষা সব সময় আমায় সজাগ রাখে, আমি যেন কাউকে কষ্ট না দিই। কারও ক্ষতি না করি। সব সময়ে মেনে চলতে পারি কি না, সেটা তো জানি না! সেটা আমার আশপাশের মানুষ বলতে পারবেন। তার মানে কি আমার মধ্যে কিচ্ছু খারাপ নেই! যাঁরা সাদা আলোর মতো ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন, তাঁদের মধ্যেও কিন্তু কালো দাগ থাকে।

    প্রশ্ন: চরিত্রের খাতিরে আদ্যোপান্ত ভদ্র অনির্বাণকে তোড়ে গালমন্দ করতে হয়েছে...

    অনির্বাণ: যা করছি চরিত্রের খাতিরে করছি। ‘রানা’ যে স্তরের, সে এই ধরনের কথাই বলে। সেটা যদি আমি না বলি বা বলতে গিয়ে অস্বস্তিতে ভুগি, তা হলে তো চরিত্র হয়ে উঠতে পারব না! ফলে, অভিনয়ের সময় এসব কিচ্ছু মাথায় রাখি না। তার মানে এটাও নয় যে আমি এ সব সমর্থন করি। আবার এগুলো না দেখালে গল্প তো বাস্তবসম্মত হয়ে উঠবে না। আবার ওই খারাপটা না থাকলে যা ভাল, সেটা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে না।

    প্রশ্ন: ইদানীং সমাজের বিশেষ কোনও স্তরের মানুষের কথা বলতে গিয়ে কি ছবি বা সিরিজ়ে গালমন্দ বা যৌনতা বেশি দেখানো হচ্ছে?

    অনির্বাণ: এটা নিয়ে তর্ক থাকতেই পারে। আমার ব্যক্তিগত মত জানানোর জায়গাও এটি নয়। তবে এটা ঠিক, গালিগালাজ বা যৌনতা বাদ দিলে সমাজের বিশেষ শ্রেণির কথা বলা বা দেখানো কিন্তু সম্ভব হবে না। ‘কালীপটকা’র মতো সিরিজ় কিন্তু ‘স্ল্যাং’ ভাষা বা যৌনদৃশ্য ছাড়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি এটাও দেখার বিষয়, অহেতুক এই ধরনের দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছে কি না। সেটা হলে অবশ্যই ঠিক নয়। আবার ‘রানা’র মুখে কিন্তু খুব বেশি গালাগালি দর্শক শুনতে পাবেন না। ‘ব্যক্তি’ অনির্বাণ এ সব খুব যে পছন্দ করেন, তা কিন্তু নয়।

    প্রশ্ন: চার অভিনেত্রীর সঙ্গে অভিনয়। কারও ‘সিন না খেয়ে’ আপনাকেও দর্শকের নজরে পড়তে হবে...

    অনির্বাণ: (কথা থামিয়ে দিয়ে) সহ-অভিনেতার ‘সিন খেয়ে নেওয়া’ আরও বেশি অশ্লীল। এতে দৃশ্য ভাল হয় না। যিনি এই কাজটি করতে যান, তাঁর অভিনয়ও খারাপ হয়ে যায়। যাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাঁরা হয়তো এই ফাঁদে পা দিতে পারেন। আমার সঙ্গে যে চার জন অভিনেত্রী কাজ করলেন, তাঁরা কিন্তু কেউ এই ধরনের কাজ করেননি। বরং, সবাই মিলে কী করে দৃশ্য জীবন্ত করা যায়, সেই চেষ্টাই করেছেন। যাঁদের সঙ্গে কাজ করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, তাঁদের তো প্রয়োজনে টুকটাক পরামর্শও দিই। যাতে কাজটা আরও ভাল হয়।

    প্রশ্ন: অনেক চর্চার পরে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়-অনির্বাণ চক্রবর্তী এক ফ্রেমে! রোমান্স আছে?

    অনির্বাণ: (হেসে ফেলে) এখনই বলা যাবে না। তবে এই সিরিজ়ের আগেও আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। দুটো ছবির শুটিং করেছি আমরা, ‘বিবি পায়রা’, ‘অশনি’। দুটোই মুক্তির অপেক্ষায়।

    প্রশ্ন: হাতে আর কী কী কাজ আছে?

    অনির্বাণ: সাতটি ছবির কাজ ডাবিং-সহ শেষ। কয়েকটি ছবির শুটিং সবে শেষ করলাম।

    প্রশ্ন: মঞ্চে আগের মতো অভিনয় করতে পারেন?

    অনির্বাণ: পারি না। তার জন্য খুব খারাপও লাগে। কিন্তু কিছু করার নেই। যাঁরা মঞ্চে পারফর্ম করেন, তাঁরা আমার যন্ত্রণা বুঝবেন।

    প্রশ্ন: পর্দায় রগচটা ‘রানা’র মনে রোমান্স জাগে?

    অনির্বাণ: হ্যাঁ, জাগে। রক্তমাংসের মানুষ তো!

    প্রশ্ন: অনির্বাণ চক্রবর্তীর?

    অনির্বাণ: আশপাশের মানুষেরা বেশি ভাল বলতে পারবেন (জোরে হাসি)।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)