• 'পরানের ক্ষীরের পান্তুয়া' খেয়েছিলেন উত্তমকুমারও
    এই সময় | ২১ জানুয়ারি ২০২৬
  • অভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, কাটোয়া

    বর্ধমান বললে যদি চোখের সামনে ভেসে ওঠে সীতাভোগ আর মিহিদানার ছবি, তা হলে শক্তিগড় মানেই লোভনীয় ল্যাংচা। তবে পিছিয়ে নেই কাটোয়াও। এই শহরের নাম করলেই যে বিষয়টি লোকের মুখে মুখে ঘোরে, তা হলো 'পরানের ক্ষীরের পাওয়া'। আক্ষরিক অর্থেই প্রাণজোড়ানো মিষ্টি। স্বাদে এবং গন্ধে এই মিষ্টির জুড়ি মেলা এখনও ভার। কাটোয়াবাসীর একাধিক গর্বের বস্তুর তালিকার মধ্যে তাই ক্ষীরের পান্তুয়া থাকে শুরুর দিকেই। দেশভাগের কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের ফরিদপুর থেকে এ পার বাংলায় এসেছিলেন সুরেন্দ্রলাল কুণ্ডু। সঙ্গে ছিলেন তাঁর তিন পুত্র বলরাম, সুধীরচন্দ্র এবং প্রাণকৃষ্ণ। জন্মভূমি ফরিদপুরেই সুরেন্দ্রলালের ছিল ঐতিহ্যশালী মিষ্টির দোকান।

    সেখানে নিয়মিত ক্ষীরের মুরুলি, অমৃতি আর পান্তুয়া তৈরি করতেন তিনি। তা খুব জনপ্রিয়ও ছিল। এ দেশে আসার পরে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়ার পরে বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়ায়, পরিবারের পেট চলবে কী করে। বেঁচে থাকার তাগিদেই কাটোয়া শহরের বারোয়ারিতলায় একটি ছোট্ট মিষ্টির দোকান খুলে ফেলেন তিনি। ফরিদপুরে যে ভাবে মিষ্টির দোকান চালাতেন, সে ভাবেই একই ধরনের মিষ্টির সম্ভার সাজিয়ে দোকান খুলে ফেলেন সুরেন্দ্রলাল। তাঁর পরে ছোট ছেলে প্রাণকৃষ্ণ ওরফে পরান এই মিষ্টির ব্যবসার হাল ধরেন। তিনিই হাতের জাদুতে বাবার দেখানো পথেই ক্ষীর দিয়ে তৈরি করেন পান্তুয়া। বাকিটা তো ইতিহাস।

    আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অপূর্ব স্বাদের জন্য ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই বিশেষ মিষ্টি। তার নতুন নামকরণ হয় 'পরানের ক্ষীর পান্তুয়া'। নামে পান্তুয়া হলেও ক্ষীরের পুর দেওয়া এই মিষ্টির আকৃতি অনেকটা ছোট ল্যাংচার মতো। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পাড়ি দেয় এই মিষ্টি। এই বিশেষ পান্তুয়ার সঙ্গে কাটোয়ার বাসিন্দাদের নানা ধরনের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। বর্তমানে যে দোকানটি রয়েছে, তার নামও 'পরানের পান্তুয়া'। শোনা যায়, বাংলা সিনেমার মহানায়ক উত্তমকুমার পর্যন্ত এই দোকানের ক্ষীরের পান্তুয়া খেয়েছিলেন। 'নিশিপদ্ম' সিনেমার শুটিংয়ের সময়ে মহানায়ক এই মিষ্টি চেখে দেখেছিলেন। তবে তালিকা সেখানেই শেষ নয়।

    রাজ্যের তাবড় নেতা-মন্ত্রীও এই মিষ্টি খেয়ে সুনাম করেছেন। কাটোয়া শহরে পর্যটকরা এলে এই পান্তুয়ার দোকানে টু না-মেরে ফিরতেই পারেন না। প্রাণকৃষ্ণ মারা যান ২০০০-এ। বর্তমানে তাঁর দুই ভাইপো তপন কুণ্ডু ও সমরেশ কুণ্ডু ব্যবসার হাল ধরেছেন। তপন বলছিলেন, 'আমাদের দোকানের তৈরি এই মিষ্টি মহানায়ক উত্তমকুমারও খেয়েছেন। তা ছাড়াও বহু নামী ব্যক্তিত্ব এর স্বাদগ্রহণ করেছেন। মানুষ যুগ যুগ ধরে এই মিষ্টি পছন্দ করছেন।' এই মিষ্টির জনপ্রিয়তা দেখে বর্তমানে শহরের অন্য মিষ্টির দোকানগুলিও এই বিশেষ মিষ্টি তৈরি করছেন। কিন্তু পরান? এখনও লা-জবাব।

  • Link to this news (এই সময়)