• প্রতিমায় সব ধর্মস্থানের মাটি, ‘গুরুজি’র সম্প্রীতির বাণী-বন্দনা এবার ৬০ বছরে, হাওড়ার বৃন্দাবন লেনের বাড়ি যেন প্রাক্তনীদের মিলনক্ষেত্র
    বর্তমান | ২২ জানুয়ারি ২০২৬
  • সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: এ যেন এক অন্যরকম বাগদেবীর বন্দনা, যেখানে ধর্মের ভেদরেখা মুছে গিয়ে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র গড়ে ওঠে। সরস্বতীর অঞ্জলিতে এখানে একসঙ্গে হাত মেলান ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। শুধু উপাসনায় নয়, দেবীর প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে ভোগের নৈবেদ্য পর্যন্ত, সবকিছুর মধ্যেই জড়িয়ে থাকে সর্বধর্মের অংশগ্রহণ। হাওড়ার বৃন্দাবন মল্লিক লেনের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দীনেশকুমার খাঁয়ের বাড়ির সরস্বতী পুজো আক্ষরিক অর্থেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক জীবন্ত নিদর্শন।সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল মিশন কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক তথা বাংলার বিভাগীয় প্রধান দীনেশকুমার খাঁ আজ ৮০ বছরের প্রবীণ। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি আজও ‘গুরুজি’। তাঁর হাত ধরেই প্রায় ছয় দশক আগে খ্রিস্টীয় কলেজ চত্বরে বাণী বন্দনার সূচনা। ১৯৬৬ সাল নাগাদ কলেজ জীবনে নিজের হাতে বাগদেবীর মূর্তি গড়ে পুজো শুরু করেছিলেন দীনেশবাবু। ১৯৭৩ সালে অধ্যাপকের চাকরি পাওয়ার পর থেকে এই পুজো ধীরে ধীরে বড়ো আকার নেয়। এবছর সেই পুজো ৬০ বছরে পা দিল। এই পুজোর মূল দর্শনেই নিহিত রয়েছে সম্প্রীতির বীজ। প্রতিমা গড়া হয় বিভিন্ন ধর্মের পড়ুয়াদের বাড়ি থেকে আনা মাটি দিয়ে। গুরুজির কথায়, ‘এখানে বাগদেবী বরাভয় মুদ্রায় অধিষ্ঠিত, মুখমণ্ডল প্রসন্ন দুর্গা আদলের। প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর বাড়ি থেকে মাটি না এলে প্রতিমা তৈরির কাজই শুরু হয় না।’ শুধু তাই নয়, নৈবেদ্যের উপকরণও আসে তাঁদের বাড়ি থেকে। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সৌরভ মাঝির বাড়ি থেকে আসে পাটালি গুড়, কাজি আবু জুম্মানের বাড়ি থেকে নারকেল, আর নাড়ু বানান আনন্দ। তাঁরা সকলেই গুরুজির প্রাক্তন ছাত্র। গত ছয় দশক ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে এই পুজোর পৌরহিত্য করছেন পরান চক্রবর্তী। আগামী কাল সরস্বতী পুজো। তারই প্রস্তুতি চলছে সর্বত্র। হাওড়ার কদমতলায় পাওয়ার হাউসের মোড় থেকে যে সরু রাস্তাটি পশ্চিমে চলে গিয়েছে, সেটাই বৃন্দাবন মল্লিক লেন। এই রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগলেই গুরুজির বাড়ি। পুজোর দু’দিন আগে গুরুজির বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, দেবীর সাজসজ্জার খুঁটিনাটি কাজে তাঁর পাশে রয়েছেন প্রাক্তন ছাত্র শেখ মকবুল ইসলাম। বর্তমানে তিনিও একই কলেজের বাংলার অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার বিষয় জগন্নাথদেব। মকবুল সাহেবের কথায়, ‘গুরুজির বাড়ির পুজো বিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে যায়। আমরা শুধু সেই ঐতিহ্যটুকুই বহন করছি।’ আজ এই পুজোয় পাঁচশোরও বেশি ছাত্রছাত্রী ভিড় করেন। ভিন রাজ্য, এমনকী ভিন দেশ থেকেও প্রাক্তনীরা ছুটে আসেন গুরুজির বাড়িতে। পুজোয় দিনভর চলে নাচ, গান, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি— বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির নানা চর্চায় মুখর হয়ে ওঠে এই বাড়ির প্রাঙ্গণ। সম্প্রীতির সুরেই এখানে বাগদেবীর আরাধনা।
  • Link to this news (বর্তমান)