নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ছোট একটা শিশুর মতো মিষ্টি। ভাবগম্ভীর রূপ তো নয়ই উল্টে কিউট দেখতে লাগে। এবছর এরকম চেহারার সরস্বতী মূর্তির বেশ চাহিদা তৈরি হয়েছে। আর সেসবের সঙ্গে দানা বেধেছে কিছু তর্ক এবং বিতর্ক-বিশ্লেষণ। শাস্ত্রজ্ঞদের মত, ‘নতুন কিছুকে স্বাগত। কিন্তু শাস্ত্রে বর্ণিত রূপ পরিবর্তন ঠিক নয়।’ শাস্ত্রে কী আছে তা নিয়ে বিশদে আলোচনাও হয়েছে। সে প্রসঙ্গে আসার আগে জেনে নেওয়া যাক কিউট সরস্বতীর বৃত্তান্ত।যে সরস্বতীর শিশুর মতো অনাবিল হাসিমুখ মাত করেছে আট থেকে আশি বয়সিদের, তাঁর রূপের উৎস কী? এই রূপ তৈরি করেছে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেনস’ (এআই)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে নতুন চেহারা পেয়েছেন দেবী। তিনি বিদ্যার দেবী। বাংলায় মোটামুটি শিশুদের দেবী বলে তাঁর পরিচিতি। অনেকের মতে, এআই’য়ের নির্দিষ্ট কোনও প্রম্পটই সম্ভবত তাঁকে বাচ্চাদের সঙ্গে একাত্ম করতে শিশুরূপ দিয়েছে। অভিনবত্ব এসেছে বিদ্যার দেবীর নতুন রূপে। শিল্পীরা কম্পিউটারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে বাগদেবীর যে রূপ সৃষ্টি করছেন তাই প্রাণ পাচ্ছে মাটির প্রতিমায়। এ উদ্ভাবন মেশিনের কারিগরি বই অন্য কিছু নয়। এই বিষয়টি জানার পরই বেধেছে গোল।শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের অনেকের বক্তব্য, সৃষ্টি বা শিল্পে অভিনবত্ব সবসময়ই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু শাস্ত্রে দেবীর যে বর্ণনা রয়েছে তাকে বিকৃত করায় আপত্তি উঠছে। সর্বভারতীয় প্রাচ্যবিদ্যা আকাদেমির অধ্যক্ষ ডঃ জয়ন্ত কুশারী জানান, প্রথমেই বলা দরকার, সর্বশুক্লা সরস্বতী। অর্থাৎ দেবীর সবটুকুই সাদা। তাঁর অর্চনার মূল মন্ত্র কিন্তু কৃত্রিম মেধা থেকে আসেনি। ঋষির ধ্যানমন্ত্র এসেছে স্বকীয় ধ্যানমন্ত্র থেকে। সেটি হল, ‘তরুণশকলমিন্দু বিভ্রতি শুভ্র কান্তি/ কুচভরণমিতাঙ্গি সন্নিসন্নাসিতাব্জে নিজকরকমলদ্যো লেখনি/ পুস্তকশ্রী সকলবিভবসিদ্ধৈঃ/পাতু বাক্ দেবতা নঃ।’অধ্যক্ষের ব্যাখ্যা, ‘অর্থাৎ সরস্বতীর রূপ বর্ণনা করা হয়েছে, তরুণ চাঁদের টুকরোর দ্যূতি বা কিরণবর্ণ যিনি ধারণ করেছেন। স্তনভারনম্র এই দেবী সাদা পদ্মের ওপর সম্যকভাবে যিনি স্থিতা বা বসে আছেন। নিজ করকমলে লেখনি ও পুস্তক ধারণ অত্যন্ত সৌন্দর্য বর্ধন করছে অর্থাৎ তাঁর রূপলাবণ্যে সুষমামণ্ডিত হচ্ছে। সকল সম্পদ (মানবসম্পদ সহ) সিদ্ধিদাত্রী এই বাকদেবী আমাদের রক্ষা ও পবিত্র বিধান করুন।’ তিনি বলেন, ‘তবে নজরে আসছে, কোথাও দেবীর রূপ শিশুর মতো। কোথাও তিনি গোলাপী পদ্মে বসেছেন। এমনকী শিল্পীর কল্পনায় হাঁসও রঙিন। দেবী কিন্তু মানবসম্পদের দেবী। তিনি দৃপ্ত ও পরিণত রূপে বরদান করেন। তাই তাঁর শৈশব চেহারা শাস্ত্রাদেশের সঙ্গে খাপ খায় না।’ এরই সঙ্গে অধ্যক্ষ বলেন, ‘পুরনো আঁকড়ে ধরে নতুন বাতিল করার মানসিকতার আমরা বিরোধী। আধুনিকতা সবসময়েই গ্রহণীয়। আমাদের শুধু বক্তব্য, শাস্ত্রকে জিইয়ে রেখে অভিনবত্ব আনা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থা। তা প্রকৃত শিল্পও বটে।’