আশাকর্মীদের বিক্ষোভ, আইএসএফের সভা, জোড়া ফলায় স্তব্ধ কলকাতা
বর্তমান | ২২ জানুয়ারি ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বুধবার বেলা প্রায় ১টা। ডোরিনা ক্রসিংয়ে বসে পড়েছেন বেগুনি শাড়ির মহিলারা! তখন পাশ দিয়ে কানফাটানো ডিজে সহযোগে শহিদ মিনারের দিকে ছুটে যাচ্ছে মানুষবোঝাই গাড়ি। ক্ষণে ক্ষণে শোনা যাচ্ছে ‘ভাইজান’ নৌশাদ সিদ্দিকির নামে স্লোগান। সিগন্যাল ‘লাল’ হয়ে আছে তো আছেই। বাইকের হ্যান্ডেল ছেড়ে গালে হাত দিয়ে বসে রয়েছেন অনেকে। চারচাকার ভিতর চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বসে আছেন কেতাদুরস্ত যুবক। বাস থেকে নেমে হাঁটা লাগিয়েছেন দলে দলে মানুষ। একদিকে আশাকর্মীদের বিক্ষোভ, অন্যদিকে আইএসএফের সমাবেশ। জোড়া ফলায় বুধবার দিনভর এভাবেই স্তব্ধ হয়ে রইল কলকাতা! কাজের দিনে পথে বেরিয়ে নাকাল হলেন অসংখ্য মানুষ।এদিন দুপুরে বিক্ষোভরত একদল আশাকর্মী যখন শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলার দিকে এগচ্ছিলেন, সেই সময় সল্টলেকে স্বাস্থ্যভবনের দিকে এগচ্ছে আর এক দল। ফলত, শহরের উত্তর-মধ্য-দক্ষিণ—সর্বত্রই যান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ধর্মতলার দিকে আসা আশাকর্মীদের মিছিল কলকাতা পুরসভার সামনেই আটকে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বেলা ১ টা থেকে পরবর্তী প্রায় ৪ ঘণ্টা স্তব্ধ হয়ে যায় এস এন ব্যানার্জি রোড। দীর্ঘক্ষণ হেঁটে যাতায়াতের উপায়ও ছিল না। কারণ, আশাকর্মীরা তখন ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পুলিশকে বারবার মাইকে বলতে শোনা যায়, ‘প্ররোচনামূলক কথা বলবেন না। আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না।’ পথচলতি মানুষের একাংশ অবশ্য প্রতিবাদী আশাকর্মীদের দেখে প্রশ্ন করেছে, ‘এই বেগুনি রং আবার কোন পার্টির?’ ততক্ষণে শহিদ মিনার ময়দানে আইএসএফের সভা শেষ হয়ে গিয়েছে। সেখানকার ভিড়ের একাংশও বাড়ি ফেরার জন্য পুরসভার কাছাকাছি এসে পড়ে। তাঁদেরও যথারীতি নাজেহাল হতে হয়। আইএসএফের প্রতিষ্ঠা দিবসের সভায় ব্যাপক ভিড় হয়েছিল। সমাবেশ থেকে নৌশাদকে জোটবার্তা দিতেও শোনা যায়। আশপাশের জেলা থেকে শিয়ালদহ-হাওড়া স্টেশন হয়ে কর্মী-সমর্থকরা আসেন। তার প্রভাব গিয়ে পড়ে শহরের যান চলাচলে। স্বাস্থ্যভবনের সামনে আশাকর্মীদের জমায়েতের জন্য ওই চত্বরে তো বটেই, সেক্টর ফাইভেও ব্যাপক যানজট হয়।জোড়া কর্মসূচির কারণে ধর্মতলা, চাঁদনি, বেন্টিংক স্ট্রিট, ডালহৌসি, এম জি রোড, মৌলালি, পার্ক স্ট্রিট, এক্সাইড সহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে তীব্র যানজটের দুর্ভোগ হয় মানুষের। ডোরিনা ক্রসিংয়ে প্রায় দু’ঘণ্টা অবরোধ চলে। ধর্মতলা চত্বরে বিকল্প রুটে যানবাহন চালাতে বাধ্য হয় পুলিশ। দক্ষিণ কলকাতা থেকে ধর্মতলা পার করতেই ৪০-৪৫ মিনিট সময় লেগে গিয়েছে।আশাকর্মীদের বিক্ষোভ-অবরোধ প্রসঙ্গে কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘কলকাতার সেন্ট্রাল ডিভিশনে আশাকর্মী, আইসিডিএস এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের কোনো জমায়েতের কথা ছিল না। তাঁরা আচমকা এখানে জমায়েত করতে শুরু করেন বলে আমরা আটকে দিতে বাধ্য হয়েছি। এখানে প্রায় ২৫০০ হাজার কর্মী চলে আসেন। ওঁদের তো আমরা ডোরিনা ক্রসিং কিংবা ধর্মতলায় বসতে দিতে পারি না। তাহলে ট্রাফিক পুরো থমকে যাবে। ওঁরা যে ডেপুটেশন দেবেন, এমন কিছুও আমাদের জানানো হয়নি।’ নিষ্ফলা বৈঠক, চলবে কর্মবিরতিনিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যে আশাকর্মীদের স্থায়ী মাসিক ভাতা ১৫ হাজার টাকা করতে হবে। মূলত এই দাবিকে সামনে রেখে প্রায় এক মাস কর্মবিরতি পালন করছে এআইইউটিইউসি (এসইউসিআইয়ের শ্রমিক সংগঠন) অনুমোদিত ‘পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়ন’। বুধবার বিকেলে স্বাস্থ্যভবনে সংগঠনের পাঁচজন প্রতিনিধি আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু নেতৃত্বের দাবি, বৈঠক নিষ্ফলা। তাঁরা কর্মবিরতি চালিয়ে যাবেন। সেই সঙ্গে এদিন পুলিশের ভূমিকা, ধরপাকড় ইত্যাদির প্রতিবাদে আজ, বৃহস্পতিবার গোটা রাজ্যে ধিক্কার কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন তাঁরা।শুধু স্থায়ী ভাতা নয়, এর পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন ছুটি ও বকেয়া অর্থ মিটিয়ে দেওয়ার দাবিও রেখেছেন তাঁরা। এসব দাবি নিয়ে এদিন স্বাস্থ্যভবনে ডেপুটেশন দিতে যাওয়ার জন্য জড়ো হন হাজার হাজার আশাকর্মী। তবে বারবার পুলিশের বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। নেতৃত্বের অভিযোগ, বিভিন্ন জেলায় পুলিশ তাঁদের কর্মীদের ট্রেনে উঠতে বাধা দিয়েছে। এমনকি, বেশ কয়েকজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয় বলেও দাবি সংগঠনের। আশাকর্মীদের আটকাতে স্বাস্থ্যভবনের সামনে তৈরি করা হয় লৌহপ্রাচীর। ধর্মতলাতেও পুলিশ ব্যারিকেড করে। ইতিমধ্যে এই আন্দোলনকে সংহতি জানিয়েছে কংগ্রেস ও সিপিএম। তবে বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায় এদিন সল্টলেকে গেলে আন্দোলনকারীরা তাঁকে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেন। পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়নের সম্পাদিকা ইসমত আরা খাতুন বলেন, ‘বৈঠকে সমাধানসূত্র মেলেনি। তাই আশাকর্মীরা রাজ্যজুড়ে কর্মবিরতি চালিয়ে যাবেন। মাতৃত্বকালীন ছুটি ও বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী ভাতা বৃদ্ধি নিয়ে কিছুই বলা হয়নি।’ তাঁর দাবি, এদিন বিক্ষোভে অংশ নিতে প্রায় ৬৫ হাজার আশাকর্মী বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। তার মধ্যে ৪৫ হাজার কর্মী কলকাতায় পৌঁছতে পারেন। সূত্রের খবর, এদিন স্বাস্থ্যসচিব স্বাস্থ্যভবনে ছিলেন না। স্বাস্থ্য অধিকর্তা, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের রাজ্যের প্রধান ও প্রোগ্রাম অফিসাররা আশাকর্মীদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন।