সুপুরি আমদানিতে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি, কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বিপাকে প্রৌঢ়, জেলে পোরার হুমকি
বর্তমান | ২২ জানুয়ারি ২০২৬
বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে আসছে হাজার হাজার টন সুপুরি। অভিযোগ, কখনও আইনের তোয়াক্কা না করে, কখনও আবার আইনকে ফাঁকি দিয়ে লরি লরি সুপুরি ঢুকছে। কয়েকশো কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে দেশের সরকার। তারপরও হাত গুটিয়ে বসে আছে কেন্দ্র। তাই এই দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়ে ক্যাবিনেট সেক্রেটারি (প্রাইম মিনিস্টারস অফিস), ভিজিল্যান্স অফিস সহ দেশের ১০টি দপ্তরে চিঠি লিখেছিলেন বিরাটির এক ব্যক্তি। তিনি আশা করেছিলেন, অভিযোগ পেয়ে নড়েচড়ে বসবে সরকার। কিন্তু তাঁকে কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্সের তরফে জানানো হয়েছে, অফিসে এসে নিজের সচিত্র পরিচয়পত্র জমা দিয়ে লিখিত অভিযোগ জানাতে হবে। দিতে হবে অভিযোগের তথ্যপ্রমাণও। ১৫ দিনের মধ্যে এসব না করলে আইন মেনে জেল-জরিমানা হতে পারে। এই অবস্থায় বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ বিরাটির ওই বাসিন্দার প্রশ্ন, ‘কার স্বার্থে চুপ কেন্দ্রীয় সরকার?’ভারতে সুপুরির বাজার কয়েক লক্ষ কোটির। গুটখা ও পানমশলার একাধিক বহুজাতিক সংস্থার রমরমা এখন। তাদের ব্যবসার মূল কাঁচামাল সুপুরি। তাছাড়া, বহু মানুষ পানের সঙ্গে সুপুরি খান। এই বিপুল চাহিদা দেশে উৎপাদিত সুপারি দিয়ে পূরণ হয় না। তাই পড়শি দেশ থেকে টন টন সুপুরি আমদানি করতে হয়। মায়ানমার থেকে চোরাপথে আসে কোটি কোটি টাকার সুপারি। সরকারি নথিতেই তার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের স্থলবন্দর দিয়ে যে লরি লরি সুপারি বৈধভাবেই আমদানি করা হয়, সেখানেও বড়সড় দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করে কেন্দ্রকে চিঠি দিয়েছিলেন বিরাটির ওই ব্যক্তি। আরও অভিযোগ, এই কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কেন্দ্রের বিভিন্ন এজেন্সির একাধিক আধিকারিক ও গেরুয়া শিবিরের কেষ্টবিষ্টুরা।বিভিন্ন কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে পেট্রাপোল স্থলবন্দর হয়ে হাজার হাজার টন সুপুরি ঢুকছে। প্রথমে এই সুপুরি বাংলাদেশে আসছে। সেখানে তা প্যাকেট করে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ছাপ দিয়ে পাঠানো হচ্ছে। ‘সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া’ (এসএএফটিএ) আইন অনুযায়ী, কোন দেশে সুপুরি উৎপাদন হচ্ছে, তার ‘কান্ট্রি অরিজিন সার্টিফিকেট’ থাকা প্রয়োজন। ব্যাংক গ্যারান্টিও লাগে। কিন্তু অভিযোগ, ভুয়ো ইনভয়েস দিয়ে সেই সুপুরি এদেশে ঢোকানো হচ্ছে। তাঁর সন্দেহ, এই চক্রের সঙ্গে ডিরেক্টরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই), শুল্কদপ্তর সহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় এজেন্সির আধিকারিকররা যুক্ত। এই কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের টন পিছু ৩ লক্ষ ৫১ হাজার টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। এক বছরের হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন। প্রত্যুত্তরে গত ১৫ জানুয়ারি দিল্লির কৌটিল্য মার্গের ভিজিল্যান্সি[ডিরেক্টরেট থেকে তাঁকে পালটা চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘আপনি কলকাতার ডিআরআই ও কাস্টমস অফিসের অফিসারদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন, তা অফিসে এসে লিখিতভাবে জানাতে হবে। আপনার সচিত্র পরিচয়পত্র ও পোস্টাল অ্যাড্রেস জমা দিতে হবে। অভিযোগের সপক্ষে কোনও প্রমাণ থাকলে তা চিঠি পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে। অন্যথায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ২১২ ধারা অনুযায়ী জেল ও জরিমানা হতে পারে। শুধু তাই নয়, শুল্কদপ্তরে তিনি বেশ কিছু তথ্য জানতে চেয়ে আরটিআই করেছিলেন। মঙ্গলবার বিকেলে তাঁকে ই-মেইল করে বুধবার দুপুরে শুনানির জন্য তলব করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি বলেন, ‘নাগরিক হয়ে দেশের স্বার্থে দুর্নীতি ধরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকেই জেলের ভয় দেখানো হচ্ছে!’