পুজোতেও স্কুলের পোশাক! নেতার অনুষ্ঠানে যেতে অনীহা ছাত্রছাত্রীদের
আনন্দবাজার | ২২ জানুয়ারি ২০২৬
ভবানীপুরের একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে প্রবল দর কষাকষি চলছে নেতা আর স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মধ্যে। নেতা বলছেন, ‘‘সমস্যায় ফেলে দিলেন! ৮০ জনকে পাঠান।’’ প্রধান শিক্ষকের উত্তর, ‘‘কত জনকে পাঠাতে পারব, কথা দিতে পারছি না!’’ রাজ্যের এক প্রথম সারির নেতার নাম করে ওই নেতা বললেন, ‘‘দাদা নিজে পতাকা তুলবেন। অন্তত ৫০ জনকে পাঠান।’’ প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘‘সরস্বতী পুজো রয়েছে। কেউ স্কুলের পোশাকে আসতে চাইছে না। আপনার তো স্কুলের পোশাকেই পড়ুয়া চাই। ১০ জনও যাবে বলে মনে হয় না।’’
বিধানসভা ভোটের বছর। এখন থেকেই নানা সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচারে নেমে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলি। সে দিক থেকে আলাদাই গুরুত্ব এ বারের ২৩ জানুয়ারি, ২৬ জানুয়ারির। এই দিনগুলিকে সামনে রেখে ব্লকে ব্লকে প্রচার চালানোর পরিকল্পনা আগেই করেছে রাজ্যের শাসক দল। বিরোধীরাও জমি ছাড়ছে না। কিন্তু এখন গোল বেঁধেছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির পরিকল্পনা করতে গিয়ে। দেখা যাচ্ছে, শহরের কোনও সরকারি স্কুল থেকেই নেতার ডাকা কর্মসূচিতে পড়ুয়া পাঠানোর আশ্বাস মিলছে না। কোনও স্কুল বলছে, ক’জনকে পাঠানো যায় দেখা হচ্ছে। কেউ স্পষ্ট জানিয়েছে, এ বার পড়ুয়া পাঠানো সম্ভব নয়।
কারণ হিসাবে তাঁরা জানিয়েছেন, এ বার সমস্যা তৈরি হয়েছে সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন আর সরস্বতী পুজো একই দিনে পড়ায়। সাধারণ পোশাকে এই একদিনই পড়ুয়ারা স্কুলে যায়। সেখানে নেতার কর্মসূচিতে যাওয়ার জন্য কাউকেই রাজি করাতে পারছেন না শিক্ষকেরা। লাভ হচ্ছে না অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুলশিক্ষক বললেন, ‘‘ব্যাপক সমস্যায় পড়েছি। নেতাদের ‘না’-ও করা যাচ্ছে না। এ দিকে বাচ্চা পাঠানো কঠিন হচ্ছে বললে তাঁরা মনে করাতে শুরু করেছেন, কখন, কোন কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি স্কুলের পাশে থেকেছেন।’’
আর এক স্কুলশিক্ষকের আবার দাবি, ‘‘সরস্বতী পুজোর নিমন্ত্রণ করে যান বলে একটি দলীয় কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে গিয়ে আমাকে শাসানো হয়েছে। বুঝতেই চাইছেন না ওই বিধায়ক। স্কুলে বৈঠক ডেকে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাতেও সমাধানসূত্র বেরোয়নি।’’
চাপের কথা খোলাখুলিই মানছেন মিত্র ইনস্টিটিউশন ভবানীপুর শাখার প্রধান শিক্ষক রাজা দে। তিনি বলেন, ‘‘২৩ জানুয়ারি স্কুলের অঞ্চলে পদযাত্রা হয়। প্রতি বারই সেখানে পড়ুয়া পাঠাতে হয়। কিন্তু এ বার সম্ভবই নয়। সরস্বতী পুজোয় স্কুলের পোশাক পরে কেউ আসতে চাইছে না।’’ ওই অঞ্চলেরই রামরিক ইনস্টিটিউশনের তরফেও স্থানীয় নেতাকে জানানো হয়েছে এ বছর পড়ুয়া পাঠানোয় সমস্যার কথা।
দ্য পার্ক ইনস্টিটিউশনের শতবার্ষিকী কমিটির সম্পাদক তথা ওই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক সুপ্রিয় পাঁজা আবার বললেন, ‘‘সমস্যা তো হচ্ছেই। শ্যামবাজারে সুভাষচন্দ্রের মূর্তির সামনে একটি অনুষ্ঠানে আমাদের ছাত্রদের যোগ দেওয়ার কথা। সেখানে মূলত স্কাউট করা পড়ুয়াদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ঠিক হয়েছে, সাধারণ পোশাকে কোনও পড়ুয়া এলেও তাকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে।’’ হিন্দু স্কুলের প্রধান শিক্ষক শুভ্রজিৎ দত্ত বললেন, ‘‘সুভাষচন্দ্রের জন্মদিন আর সরস্বতী পুজো এ বার একসঙ্গে পালন করা হচ্ছে। সরস্বতী পুজো মানে বাঙালির কাছে বিদ্যার আরাধনার দিন, সুভাষচন্দ্রের জন্মদিনও অন্যতম এক আবেগের দিন। সব দিক মাথায় রেখেই আয়োজন করতে হচ্ছে।’’