পুজোর আয়োজন থেকে পৌরোহিত্য, স্কুলে দায়িত্বে ছাত্রীরাই
আনন্দবাজার | ২২ জানুয়ারি ২০২৬
স্কুলের ছাত্রীদের দিয়ে ২০২৩ সালে প্রথম বার সরস্বতী পুজো করিয়েছিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। তার পর থেকে ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে’। এই বছর শতবর্ষে পা রেখেছে হাওড়ার বালি বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয়। ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার সরকারি স্কুলটিতে বিদ্যাদায়িনীর পুজো, পুষ্পাঞ্জলি এবং সন্ধ্যারতি সবটাই সম্পন্ন হবে ছাত্রীদের হাতে। থিম, মেয়েদের পুজো মেয়েরাই করে।
স্কুলের টিচার ইন চার্জ সোনালি দত্তের কাছ থেকে জানা গেল, মেয়েদের স্কুল হলেও এখানকার পড়ুয়াদের বেড়ে ওঠায় কোনও লিঙ্গবৈষম্য নেই। প্রয়োজনে মেয়েরাই চেয়ার-টেবিল টেনে যে কোনও প্রদর্শনীর ঘর সাজায় বা রবীন্দ্র ভবনে অনুষ্ঠানের আগে তার আয়োজন সারে। তবে শুধু পৌরোহিত্যে নয়, লিঙ্গসাম্যের পাঠ বহু বছর থেকেই পড়ানো চলছে এই স্কুলে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও সময়োপযোগী চিন্তাভাবনা স্কুলে শিক্ষিকারা বার বার গেঁথে দিতে চেয়েছেন মেয়েদের মনে। এখানে নম্বরভিত্তিকপড়াশোনার চেয়ে জীবনের প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক শিক্ষাগুলিই প্রতিটি মুহূর্তে স্মরণ করানো হয়। নাচ, গান, আঁকার পাশাপাশি বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে কিংবা যোগব্যায়াম, খেলাধুলোয়ও সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে স্কুলের ছাত্রীদের। তবে সরাসরি শ্রেণিকক্ষ থেকে তুলে এনে ছাত্রীদের দিয়েই বাগ্দেবীর পুজো সম্পন্ন করানোর অভিনব ভাবনা স্কুলটিকে করে তুলেছে অনন্য।
শিক্ষিকারা জানাচ্ছেন, স্কুলে বহু বছর ধরেই সরস্বতী পুজোর দায়িত্ব সামলায় ছাত্রীরা। নিজেরা রঙিন কাগজ কেটে দেওয়ালসাজানো, নানা শৈল্পিক কারুকার্য, শিল্পালয় থেকে প্রতিমা আনতে যাওয়া, পুজোর উপকরণ জোগাড়, এমনকি, প্রতিমা বিসর্জনেও স্কুলের ছাত্রীরাই দিনরাত এক করে দায়িত্ব পালন করত। শুধু মন্ত্র পাঠ করে পুজোরদায়িত্বটুকুই দেওয়া হত বাইরের পুরোহিতকে।
কিন্তু বদলে যাওয়ার সময়ে শিক্ষিকারা অনুভব করেন, মন্ত্র পড়ে পুজোপাঠের চেয়েও আত্মিক যোগাযোগের শ্রদ্ধাঞ্জলি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্কুলের ছাত্রীদের দিয়েই দেবী বোধনের চিন্তাভাবনাশুরু হয়। এগিয়ে আসে সম্পর্কে বোন, স্কুলের দুই ছাত্রী দেবারতি চক্রবর্তী ও দেবদত্তা চক্রবর্তী। তাদের বাবা পেশাদার পুরোহিত। বাবার কাছেই সংস্কৃত মন্ত্র পড়ে পৌরোহিত্যের হাতেখড়ি। প্রাচীনপন্থী ভাবনা, আজন্মলালিত সংস্কার সরিয়ে ওই মেয়েরাই মন্ত্র পড়ল ২০২৩-এ। সে বার কিছু মানুষ নাক সিঁটকে অঞ্জলি দিলেন না।তবে তাতে মেয়েদের সরস্বতী পুজো করা থামেনি।
এই বছর স্কুলের শতবর্ষ। সংস্কৃত মন্ত্র পড়ে, আচার মেনে সরস্বতী পুজো করবে স্কুলের মেয়েরাই। সঙ্গে থাকবেন রবি ঠাকুর। তাঁর গান ও কবিতায় ধ্বনিত হবে পুজো প্রাঙ্গণ। এই স্কুলের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নামও যে জড়িয়ে। বিশ্বভারতীর ‘আমাদের শান্তিনিকেতন’ প্রার্থনা সঙ্গীতের অনুকরণে ‘আমাদের বিদ্যানিকেতন’ এই স্কুলে গাওয়া হয়ে থাকে। কথিত আছে, স্কুলের নামকরণটিও রবি ঠাকুরেরই করা। এমনকি, স্কুল প্রতিষ্ঠার পরে রবীন্দ্রনাথ উন্নতি কামনা করে আশীর্বাদপত্রও প্রেরণ করেছিলেন। বিশ্বভারতীর টাইপ করা চিঠিতে তাঁর সই করা চিঠি স্কুলে সংরক্ষিত রয়েছে সযত্নে।
স্কুলের প্রাক্তনী অনিন্দিতা দাস বলেন, ‘‘দেবদত্তা, দেবারতি সংস্কৃত মন্ত্র পড়ে সরস্বতী পুজো করবে। আর এক জন ছাত্রী সেটারই বাংলা অনুবাদ করে তার সঙ্গে সঙ্গেই বলবে। আমরা কয়েক জন পুজোর মাঝখানে বাআয়োজনের ফাঁকে ফাঁকে গান-কবিতা পাঠ করব।’’
একে সরকারি স্কুল। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর দশা। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে জায়গায় জায়গায়।সম্প্রতি প্রাক্তনীদের অর্থানুকূল্যে কোনও মতে বিজ্ঞান পরীক্ষাগারের সংস্কার সম্ভব হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে আধুনিক শিক্ষা সরঞ্জামের অভাব স্পষ্ট। অনেকেই বলছেন, এখানে আগের মতো আর পড়তেও আসে না সম্পন্ন ঘরের ছাত্রীরা।ইংরেজি মাধ্যমের আকর্ষণ কাটিয়ে মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরাই ভর্তি হয় এখানে। স্কুলছুটের সংখ্যাও কম নয়। কী ভাবে পড়ুয়াদের স্কুলের সঙ্গে যুক্ত রাখা যায়,আপ্রাণ চেষ্টা করেন শিক্ষিকারা। কখনও শিক্ষামূলক ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হয়। ১০০ বছরের গৌরবের শিখার নীচে আপাতত টিমটিম করে জ্বলছে সরকারি স্কুলটি। তার মধ্যেও এমন প্রগতিশীল ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যেতে সাহস লাগে বইকি!