চেন্নাই ও অন্ধ্রে রহস্যমৃত্যু দুই পরিযায়ী শ্রমিকের
দৈনিক স্টেটসম্যান | ২২ জানুয়ারি ২০২৬
মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের নাম মঞ্জুর আলম লস্কর। বয়স ৩২ বছর। তিনি রঙ্গিলাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা। প্রায় ১০ বছর ধরে অন্ধ্রপ্রদেশের কোমারুল এলাকায় কাজ করেন তিনি। মাঝে মধ্যেই বাড়িতে আসতেন। তাঁর দাদা গিয়াসউদ্দিন লস্কর স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান।
নিহতের পরিবার জানিয়েছেন, জরির কাজ করতে অন্ধ্রপ্রদেশে গিয়েছিলেন মঞ্জুর। মঙ্গলবার অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে মঞ্জুরের বাড়িতে একটি ফোন আসে। ফোনে শ্রমিকের পরিবারের কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে মেরে ফেলার হুকমি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ফোন পাওয়ার পর ছ’হাজার টাকা পাঠায় মঞ্জুরের পরিবার। তবে টাকা পাঠিয়েও শেষরক্ষা হয়নি। বুধবার মঞ্জুরের মৃত্যুর খবর আসে।
নিহতের পরিবারের দাবি, চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মঞ্জুরকে ফাঁসানো হয়েছে। তাঁকে আটকে রেখে মারধরও করা হয় বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার। বুধবার মঞ্জুরের বাড়িতে ফোন আসে। তাতেই মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে সরব হয়েছে তৃণমূল। তাদের দাবি, বাংলায় কথা বলতে দেখেই ওই শ্রমিককে নিশানা করা হয়। স্থানীয় বিজেপি কর্মী ও সমর্থকেরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
অন্ধ্রপ্রদেশ ছাড়া চেন্নাইতেও এক পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যমৃত্যু হয়েছে। আটদিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন ওই পরিযায়ী শ্রমিক। অবশেষে রেললাইনের ধারের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সেই পরিযায়ী শ্রমিকের দেহ। ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে তাঁর দেহ।
নিহত যুবকের নাম আলমগির আলম। বয়স উনত্রিশ বছর। বাড়ি মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের মশালদহ বাজার এলাকায়। ওই যুবককে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। আলমগির পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য ছিলেন। তাঁর বাড়িতে আছেন দুই সন্তান এবং স্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুতে অথৈ জলে পড়েছেন শ্রমিকের স্ত্রী। চেন্নাই থেকে দেহ ফেরাতে স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।
মৃত পরিযায়ী শ্রমিক আলমগিরের ভাই আবু সামা জানিয়েছেন, চেন্নাইতে কাজ করতেন তাঁর দাদা। সেখান থেকে ৯ দিন আগে অন্য একটি কাজের জন্য হায়দরাবাদে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। চেন্নাই থেকে হায়দরাবাদ যাওয়ার জন্য ট্রেনেও ওঠেন আলমগির। স্ত্রী হাবানুর খাতুনের সঙ্গে সেই সময় ফোনে কথাও হয়। তারপর থেকেই তাঁর আর কোনও খোঁজ নেই। ফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। আলমগিরের সহকর্মীরা স্থানীয় থানায় তাঁর নিখোঁজের বিষয়টি জানিয়ে ছিলেন। টানা আটদিন এভাবেই কেটেছে। চেন্নাইয়ের যে স্টেশন থেকে হায়দরাবাদ যাওয়ার জন্য তাঁর ট্রেনে ওঠার কথা ছিল, তার পরের স্টেশনের কাছাকাছি এলাকায় রেললাইনের ধারে জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় আলমগিরের ক্ষতবিক্ষত দেহ।
যুবকের মৃত্যু খবর বুধবার রাতে বাড়িতে এসে পৌঁছোয়। সেই খবর আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আলমগিরের স্ত্রী। এই পরিস্থিতিতে হরিশ্চন্দ্রপুরের বাসিন্দাদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে অসহায় পরিবার। দেহ কীভাবে বাড়িতে ফিরবে তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। যদিও স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে আলমগিরের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে।
তৃণমূল ব্লক আইএনটিটিউসি সভাপতি সাহেব দাসের দাবি, ‘১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে বিপাকে ফেলেছে বিজেপিই। যদি ১০০ দিনের কাজ চালু থাকত, তবে কাউকে রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র যেতে হত না। এ রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকেরা বিজেপিশাসিত রাজ্যে কাজে গেলে তাঁদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে।’ তৃণমূলের বিরুদ্ধে পাল্টা তোপ দেগেছে বিজেপি। জেলা বিজেপি সম্পাদক রূপেশ আগরওয়াল বলেন, ‘তৃণমূলের জমানায় রাজ্যে কোনও কাজ নেই। বেকার যুবক-যুবতীরা তাই কাজের খোঁজে ভিন্রাজ্যে যাচ্ছেন। বিজেপিশাসিত রাজ্যে কাজ আছে, তাই সেখানে যাচ্ছেন।’ আগমগিরকে খুন করার প্রসঙ্গে বিজেপি নেতার দাবি, বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে সে রাজ্যের পুলিশ।
গত ১৬ জানুয়ারি ঝাড়খণ্ডে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ওই এলাকা। পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখকে খুন করা হয়েছে বলে দাবি করেন পরিবারের সদস্যরা। জাতীয় সড়ক অবরোধের পাশাপাশি চলে ভাঙচুর। রেলের ক্রশিং ভেঙে ফেলা হয়। অবরোধের জেরে ব্যাহত হয় ট্রেন পরিষেবা। অবশেষে প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপে তা নিয়ন্ত্রণে আসে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের দুই পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে এল।