• মঙ্গলে পুজো, শুক্রে নমাজ! বাগদেবীর আরাধনায় চর্চা, মধ্যপ্রদেশের ‘ভোজশালা’র ইতিহাস জানেন?
    এই সময় | ২২ জানুয়ারি ২০২৬
  • প্রতি মঙ্গলবার হিন্দুরা পুজো দেন। আবার প্রতি শুক্রবার মুসলিমরা সেখানে নমাজ পড়েন। স্থাপত্য একটিই। যার বর্তমান নাম ‘ভোজশালা মন্দির-কমাল মওলা মসজিদ কমপ্লেক্স’। বহু সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাক্রমের সাক্ষী মধ্যপ্রদেশের ধারে অবস্থিত এই প্রার্থনা স্থল। যা বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

    ১০৩৪ খ্রিস্টাব্দে পরমার রাজবংশের রাজা ভোজ ধর একটি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কোনও সাধারণ বিদ্যালয় নয়, বরং নালন্দা ও তক্ষশিলার সমতুল্য একটি বিশাল আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। কেবল একটি শিক্ষাঙ্গন নয়, শিক্ষা, সাহিত্য, ইতিহাস চর্চার পীঠস্থান হয়ে উঠেছিল এই প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীকালে এটিই ‘ভোজশালা’ নামে পরিচিত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে পড়াশোনা করতেন। ভোজশালা এমন একটি স্থান হিসেবে গড়ে উঠেছিল, যেখানে শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতা অবিচ্ছেদ্য ছিল।

    শত শত কারুকার্য খচিত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে এই প্রতিষ্ঠান। দেওয়ালে ছিল বিভিন্ন দেব-দেবীর ভাস্কর্য। শিক্ষাঙ্গনের মধ্যস্থানে ছিল একটি বিশাল যজ্ঞকুণ্ড। মধ্যপ্রদেশ সরকারের সরকারি ওয়েবসাইট অনুসারে, কালিদাস থেকে শুরু করে বাণভট্ট, ভবভূতি, মাঘ, ধনপাল এবং আরও অনেক মনীষী এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

    ১০৩৫ খ্রিস্টাব্দে বসন্ত পঞ্চমীর দিনে দেবী সরস্বতীর (বাগদেবী) একটি অত্যন্ত সুন্দর মূর্তির প্রতিষ্ঠা করা হয় ভোজশালায়। কমবেশি ২৭১ বছর ধরে ভোজশালা জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। জৈন পন্ডিত অভয়দেবজি ভোজশালাতেই ‘সুরি’ উপাধি লাভ করেন। রাজা ভোজ নিজেও একজন পন্ডিত ছিলেন। ৭২টি শিল্পকলা এবং ৩৬টি অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন তিনি। তবে গোটা দেশ থেকে বিভিন্ন পন্ডিতদের এই প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার ব্যাপারে উদ্যোগী ছিলেন রাজা ভোজ।

    চতুর্দশ শতাব্দীতে মালব বারবার আক্রমণের শিকার হয়। ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন খিলজি পরমার রাজত্বের অবসান ঘটান। ভোজশালা-সহ অনেক ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান ধ্বংসের শিকার হয়। ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে মাহমুদ শাহ খিলজি (দ্বিতীয়) ভোজশালাকে মসজিদে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেন। বাইরে একটি সমাধি নির্মিত হয়, যা কমাল মওলানার সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও ঐতিহাসিক মতান্তর রয়েছে এই দাবি নিয়ে। মওলানা ১৩১০ খ্রিস্টাব্দে মারা গিয়েছিলেন বলে কিছু ঐতিহাসিক দাবি করেন।

    এর পরে ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ অফিসার মেজর জেনারেল উইলিয়াম কিনকেইড ভোজশালায় খননকার্য পরিচালনা করেন। বেশ কিছু জায়গায় দাবি করা হয়েছে, এই সময়েই বাগদেবীর ভাঙা মূর্তিটি লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১৫১ বছর ধরে মূর্তিটি গ্রেট রাসেল স্ট্রিটের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রয়েছে। এই স্থাপত্যের বর্তমান রূপ নেয় বিংশ শতাব্দীতে।

    ১৯৩৬ সালে মুসলমানরা ভোজশালায় নামাজ পড়ার অনুমতি চেয়েছিল। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিরোধের কারণে তা সম্ভব হয়নি। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ছিল। অবশেষে, ধার রাজ্যের শাসক একটি মসজিদের জন্য আলাদা জমি বরাদ্দ করেন, যা আজকের রহমত মসজিদ।

    সরকারি নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, মূল সরস্বতী মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনও কামাল মওলানা মসজিদ চত্বরের মধ্যে দেখা যায়। মসজিদের বিশাল খোলা আঙিনা, স্তম্ভযুক্ত বারান্দা এবং পশ্চিম দিকের প্রার্থনা কক্ষে এমন অলঙ্কৃত খোদাই করা স্তম্ভ ও ছাদ রয়েছে, যা মূলত ভোজশালারই অংশ ছিল বলে দাবি কর হয়। প্রাকৃত ভাষায় লেখা স্তোত্র, সর্পবেষ্টিত স্তম্ভের শিলালিপিতে সংস্কৃত বর্ণমালা, ব্যাকরণের নিয়ম, কাল ও প্রকারভেদ খোদাই করা আছে বলেও দাবি করা হয়।

    প্রতি বছরেই সরস্বতী পুজোর দিনেও চর্চায় উঠে আসে এই স্থাপত্যের কথা। আগে মধ্যপ্রদেশের হাই কোর্টের নির্দেশে এই ঐতিহাসিক সৌধে ‘বৈজ্ঞানিক’ পরীক্ষার কাজ শুরু হয়েছিল। ২০২৪ সালে সেই কাজ শুরু হয়। হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় মুসলিম পক্ষ। শীর্ষ আদালত, এই জায়গায় ‘বৈজ্ঞানিক’ পরীক্ষার নির্দেশ দিলেও এই কাঠামো পরিবর্তনের ব্যাপারে কোনও নির্দেশিকা দেয়নি। বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার পুজোর দিন ও শুক্রবার নমাজ পাঠের দিন বাদ দিয়ে বাকি দিনগুলিতে পর্যটকরা এই সৌধ দর্শন করতে পারেন, কোনও ধর্মীয় আচার পালন করতে দেওয়া হয় না।

  • Link to this news (এই সময়)