• উর্দি ছেড়ে তদন্তে পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট সাজলেন প্রিন্সিপাল, শিশুকে ন্যায় দিতে ‘অন্য পথ’ প্রশাসনের
    এই সময় | ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
  • অপহরণ করে লাগাতার ধর্ষণ করা হয়েছিল সাত বছরের এক শিশুকে। ঘটনার অভিঘাতে আতঙ্কে কাঁটা হয়েছিল ওই শিশু। সে এতটাই ট্রমার মধ্যে ছিল যে সপ্তাহখানেক ধরে তদন্তকারীদের সঙ্গে কথাই বলতে পারেনি। পুলিশের উর্দি পরা কাউকে দেখলে কিংবা কালো কোট পরা আইনজীবীদের দেখলেই প্রবল আতঙ্কিত হয়ে পড়ত নির্যাতিতা শিশুটি। কিন্তু হাল ছাড়েনি গুজরাটের রাজকোট গ্রামীণ এলাকার পুলিশ। চলতি পদ্ধতিতে তদন্ত করা যাবে না বুঝে, একেবারেই অন্য রাস্তা নেয় তারা।

    সর্বভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই মামলায় তদন্ত চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করে কাজ শুরু করেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেন্ডেন্ট অফ পুলিশ (ASP) সিমরান ভরদ্বাজ। আতঙ্কে দিশেহারা ওই শিশুর ভরসা পেতে উর্দি ছাড়েন তিনি। সাধারণ পোশাকে একেবারে আম-আদমির মতো ওই শিশুর সঙ্গে সময় কাটাতে থাকেন তিনি। বেশ কয়েকদিন এ ভাবেই যায়। সাধারণ কথাবার্তা, খেলাধুলো করে, উপহার দিয়ে শিশুটির বিশ্বাস অর্জন করেন ওই পুলিশ অফিসার। তাঁকে ভরসা করে কিছুদিন পরে মুখ খোলে নিগৃহীতা শিশু। গত ডিসেম্বরে তার সঙ্গে কী ভাবে শারীরিক অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছিল, তা বিস্তারিত জানায় সে।

    কিন্তু নিগৃহীতার জবানবন্দি নেওয়ার সময়েও নতুন করে চ্যালেঞ্জ এসে উপস্থিত হয়। BNSS অর্থাৎ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৮৩ নম্বর সেকশন অনুযায়ী, নির্যাতিতার জবানবন্দি রেকর্ড করতে পারবেন একমাত্র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। সেই সময়ে সেখানে কোনও পুলিশ অফিসার উপস্থিত থাকতে পারবেন না। সেই নিয়ম অনুযায়ী জবানবন্দি নিতে গিয়ে ফের ভেঙে পড়ে ওই শিশু। বাধ্য হয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করে পুলিশ-প্রশাসন।

    সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, সমস্যা মেটাতে নতুন পরিকল্পনা করেন এএসপি ভরদ্বাজ। শিশুকে বোঝানো হয় তাকে একটি নামী স্কুল ভর্তি করাতে চায়। সেখানে ইন্টারভিউয়ের জন্য যেতে হবে। সেখানে একজন প্রিন্সিপাল বা প্রধানশিক্ষক তার ইন্টারভিউ নেবেন। ইন্টারভিউ বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ওই শিশুকে নতুন পোশাক এবং স্কুলব্যাগও কিনে দেওয়া হয়। এই সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি সাধারণ পোশাকে প্রিন্সিপাল সাজেন। দীর্ঘ সময় ধরে ওই শিশুর সঙ্গে গল্প করে পরিবেশ সহজ করে তোলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা সফল হয়। ওই শিশুর থেকে দু’পাতার জবানবন্দি জোগাড় করা সম্ভব হয়।

    এর পরে টেস্ট আইডেন্টিফিকেশন প্যারেড (টিআই) সফল করতে নতুন পরিকল্পনা করে পুলিশ। আদালতের অনুমতি নিয়ে পুলিশের জায়গার বদলে নিগৃহীতা শিশুর সুবিধা অনুযায়ী অন্যত্র টিআই প্যারেড করানো হয়। ম্যাজিস্ট্রেট নির্দেশ দেন, সন্দেহভাজনদের হাতে খেলনা দিয়ে দাঁড় করাতে। শিশুটির জন্য যতটা সম্ভব সহজ পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য ওয়ান-ওয়ে মিরর দিয়ে সন্দেহভাজনদের দেখে অপরাধীকে শনাক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়। এরপরে ওই সাত বছরের শিশু অপরাধীকে শনাক্ত করে।

    মামলা চলাকালীন একাধিক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। ভরা আদালতে পুলিশ ও আইনজীবীদের ভিড় দেখে ওই শিশু ফের ভেঙে পড়তে পারে এই আশঙ্কা করা হয়েছিল। সেই কারণে ওই শিশু এবং তার পরিবারের লোকেদের মানসিক ভাবে প্রস্তুত করা হয়। মক টেস্টিমনি নিয়ে তাদের তৈরি করা হয়। শুনানির সময়ে সাধারণ পোশাকে হাজির ছিলেন তদন্তকারী অফিসার। প্রয়োজনীয় ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকে আদালত কক্ষে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

    অবশেষে এত পরিশ্রমের ফল মেলে। অভিযুক্ত রামসিং দুদভা (৩২) ওই শিশুকে অপহরণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়। এফআইআর দায়েরের পরে মাত্র ৪১ দিনের মাথায় বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আদালত দোষীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

  • Link to this news (এই সময়)