মিল্টন সেন, হুগলি,২২ জানুয়ারি: ভিক্ষে না করলে খাবার জুটবে না। সেটা জেনেও শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে। নষ্ট হলো একটা দিন। কীভাবে কী হবে জানেন না। কাকে অভিযোগ করবেন? কিছুই জানেন না প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা ভিক্ষুক। কার্যত এসআইআরের দৌলতে মুছেছে নোবেল জয়ী থেকে মূর্খ বা উঁচুনিচু ধনী গরীব, ধর্ম বর্ণের বিভেদ। নবীন প্রবীন নেতা অভিনেতা থেকে বিজ্ঞানী বা প্রান্তিক মানুষ ভিক্ষুক সকলেই দাঁড়াচ্ছেন এক লাইনে। এবার এসআইআরের শুনানির জেরে টান পড়েছে রুজি রুটিতে।
বৃহস্পতিবার চন্দননগর মহকুমা শাসক দপ্তরে দেখা গেলো এমনই একজন ভিক্ষুক বৃদ্ধাকে। একটা গোটা দিন যার ঘুরে ঘুরে ভিক্ষে না করলে পেট চলবে না, তিনিও শুনানির লাইনে। জানা গিয়েছে, তিনি কার্যত পঙ্গু, হাত পায়ে বল নেই। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। তাতে এসআইআর নথি নিয়ে শুনানিতে হাজির হয়েছেন বৃদ্ধা পারুল ব্যানার্জি। চন্দননগর ২ নম্বর নিরঞ্জন নগর এলাকায় তার বাড়ি। স্বামীর প্রয়াণের পর থেকে ভিক্ষাবৃত্তি তাঁর পেশা। মেয়ে নাতিকে নিয়ে কোনও ভাবে দিন গুজরান করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে এর আগে তিনি পরিচারিকার কাজ করতেন।
একবার পরে গিয়ে তাঁর হাত ভেঙেছিল। সেই হাতের হাঁড় আর জোরা লাগেনি। তাই প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেটও পেয়েছেন। এই বৃদ্ধ বয়সে তাই ভিক্ষাই তাঁর জীবিকা। কিন্তু একটা দিন শুনানিতে এসে তাঁর সময় নষ্ট হলে চলবে কি করে? তাই শুনানিতে এসেও ভিক্ষাই সংগ্রহ করলেন। এদিন বৃদ্ধা বলেন, সেই ৭২ সাল থেকে তিনি ভোট দিয়ে আসছেন। তার পরেও তাঁর ডাক পড়েছে। কেনো তাঁকে ডেকেছে তিনি জানেন না। সবাইকেই তো ডাকছে। এখন ভাঙা হাতে আর কাজ করতে পারেন না। তাই চেয়ে চিন্তে চলে। আগে তাঁর মেয়ে আয়ার কাজ করতেন। এখন তিনিও বাড়িতে বসা। কিন্তু তাঁর বসে থাকার জো নেই। শুনানিতে তাঁর সময় নষ্ট হলেও কিছু করার নেই। কাউকে কিছু বলারও নেই।
প্রসঙ্গত, এসআইআর নিয়ে হয়রানির শেষ নেই। শুনানির ডাক পাচ্ছেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধী। বাদ পড়ছেন না কেউই। তৃণমূলে প্রথম দিন থেকে অভিযোগ করে আসছে যে এসআইআর-কে হাতিয়ার করে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে। এরই জ্বলন্ত উদাহরণ দেখা গেল মগরায়।
মঙ্গলবার সকালে মগরায় হুইলচেয়ারে বসে শুনানিতে হাজির হতে দেখা যায় সপ্তগ্রাম পঞ্চায়েতের ছোট খেজুরিয়া এলাকার বাসিন্দা বিশেষভাবে সক্ষম কুমকুম হরিজনকে। এদিন তাঁর শুনানির ডাক পড়েছিব মগরা ব্লক অফিসে। কুমকুমের মা তাঁকে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে আসেন শুনানিকেন্দ্রে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়ানোর পরে বিএলও অনিতা দত্ত কর্মরত অফিসারকে অনুরোধ করেন কুমকুমের শুনানি তাড়াতাড়ি করার জন্য। বিএলওর অনুরোধ শুনে কিছুক্ষণ পরে তাঁর শুনানি সম্পন্ন করে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই বিষয়ে হুগলি জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ নির্মাল্য চক্রবর্তী বলেন, “এসআইআর-এর নামে সাধারণ মানুষের হয়রানি ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কেন্দ্রে একটা অমানবিক সরকার চলছে। এরা মানুষের সাথে-পাশে থাকে না। বয়স্ক মানুষ হোক বা প্রতিবন্ধী সকলকে শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। সারাদিন লাইনে দাড়িয়ে আবার অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন কিন্তু তাতেও টনক নড়ছে না নির্বাচন কমিশনের।”
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন সংবিধান বিরোধী কাজ করছে, বারবার নিয়ম বদলাচ্ছে। ফলে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই অভিযোগে এবং এসআইআর নিয়ে হয়রানির প্রতিবাদে রাস্তায় আন্দোলনে নামল ফুরফুরা। নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ফুরফুরা শরিফের পিরজাদা সাফেরি সিদ্দিকির ডাকে ফুরফুরায় সংগঠিত হল মিছিল।
মঙ্গলবার উজলপুকুর ধার থেকে মিছিল শুরু হয় শেষ হয় ফুরফুরা মাজার শরিফে। এদিন পিরজাদা সাফেরি সিদ্দিকি বলেছেন, “নির্বাচন কমিশন গাঁজাখোর। সংবিধান-বিরোধী কাজ করছে। না হলে বার বার সিদ্ধান্ত বদল করতে পারে না। যত মানুষকে শুনানির নোটিশ দেওয়া হয়েছে তাঁদের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা বেশি। আবার তাঁদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাও বেশি। কেনও এভাবে হয়রানি করা হবে। এর কোনও জবাব নেই। খালি বলছে এই কাগজ চলবে না। ওই কাগজ চলবে না। তাহলে চলবে টা কী? সেটা পরিষ্কার করে বলছে না।” সাফেরি সিদ্দিকী প্রশ্ন তুলেছেন, “যে নথি চাওয়া হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনারের নিজের ওই ওই নথি আছে কি।”
সোমবার সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি বা তথ্যগত অসঙ্গতির তালিক পঞ্চায়েতে টাঙাতে হবে। তাই তিনি সকলকে সঙ্গে নিয়ে বুধবার পঞ্চায়েতে ভিড় করবেন বলে জানিয়েছেন পিরজাদা।