আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাঙালি মাততে চলেছে সরস্বতী পুজোর আনন্দে। শুক্রবারে বিদ্যার দেবী বাগদেবীর পুজো। আর সেই পুজোর প্রস্তুতিতে বাংলার ঘরে ঘরে এখন সাজো সাজো রব। স্কুল-কলেজ-বাড়ি-পাড়ার মণ্ডপ সব জায়গায় এখন শেষ মুহূর্তের পুজোর প্রস্তুতি চলছে। সবমিলিয়ে এক অভূতপূর্ব আনন্দের পরিবেশ।
শুক্রবার বাঙালিদের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। দেশ বরেণ্য নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন। বাঙালির এই সরস্বতী পুজোর আনন্দ শুধু উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও অদম্য চেতনার ইতিহাস। বিশেষ করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনের এক অধ্যায় এই পুজোকে আরও গভীর অর্থ দান করে।
ব্রিটিশদের ভারত ছাড়া করতে দেশ স্বাধীন করার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। ১৯২৩-২৪ সাল নাগাদ তিনি যখন গ্রেপ্তার হন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর জেলে (যা বর্তমানে মানসিক হাসপাতাল) বেশ কিছুদিন বন্দি করে রেখেছিলেন। সেই সময় সুভাষ ওই জেলের কুঠুরিতে দিনের পর দিন থাকা অন্যান্য রাজবন্দীদেরকে নিয়ে সরস্বতী পুজোর আয়োজন করেছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক দাবি করেন।
ইতিহাসের পাতা ঘাটলে জানা যায়, ১৯২৩-২৪ সাল নাগাদ সুভাষচন্দ্র বসু যখন মুর্শিদাবাদের বহরমপুর জেলে বন্দি ছিলেন সেই সময় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে জেলের ৭ নম্বর ঘরে বন্দি রেখেছিল। জেলের সেই কঠিন পরিবেশেও সুভাষচন্দ্রের মনে বাঙালির ধর্ম সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের প্রতি অটুট বিশ্বাস ছিল।
বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, জেলবন্দি থাকার সময়ে সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে জেলের একটি কোণে সরস্বতী পুজো করতে চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষ প্রথমে সুভাষের এই অনুরোধে কর্ণপাতই করেনি। তবে সুভাষ বেঁকে বসায় পরে তাঁর অনুরোধ মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকার।
তারপর কয়েদিদের সঙ্গে মিলে সীমিত সামগ্রী নিয়ে সরস্বতীর আরাধনা জেলেই করেছিলেন সুভাষ। জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে সেই পুজো হয়ে ওঠে এক বিদ্রোহের প্রতীক।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক দস্তাবেজ থেকে আরও জানা যায়, সুভাষ যখন বহরমপুর জেলে বন্দী ছিলেন সেই সময় তাঁর সরস্বতী পুজো দেখতে যাওয়ার অছিলায় অনেকেই জেলে এই দেশবরেণ্য নেতার সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন। যদিও কিছু কিছু ঐতিহাসিক দাবি করেন, সুভাষ বহরমপুরের জেলে বন্দি থাকার সময় দুর্গাপুজো করেছিলেন। তবে সুভাষচন্দ্র বসু ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে জেলের লেটার প্যাডে নিজের দাদা শরৎচন্দ্র বসুকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন ৩ ডিসেম্বর ১৯২৪ তারিখে তিনি বহরমপুরে এসে পৌঁছেছেন। সুভাষ বহরমপুর জেল থেকে ২৫ জানুয়ারি ১৯২৫ সালে চলে যান। ঐতিহাসিকদের দাবি এই চিঠি লেখার তারিখ প্রমাণ করে সময়টি দুর্গাপুজোর ছিল না। তাই বেশিরভাগ ঐতিহাসিকের দাবি, বহরমপুরে জেলবন্দি থাকার সময় সুভাষ সরস্বতী পুজোই করেছিলেন।
মুর্শিদাবাদ জেলার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক বিষাণ গুপ্ত বলেন, "বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং প্রখ্যাত লেখক খাইরুল আলম এবং প্রফুল্ল গুপ্তের বই থেকে আমরা জানতে পারি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর কর্মজীবনে একাধিকবার মুর্শিদাবাদ জেলায় এসেছিলেন এবং এই জেলার সঙ্গে সুভাষের নিবিড় সম্পর্ক ছিল।" বহরমপুরের খাগড়া এলাকায় বর্তমানে যেখানে নেতাজির মূর্তি রয়েছে সেখানে সুভাষ চন্দ্র বসু বক্তৃতাও করেছিলেন বলে একাধিক ঐতিহাসিক দাবি করেন। শুধু সুভাষ নয় ব্রিটিশদের বহরমপুরের এই জেলে একসময় কাজী নজরুল ইসলামও বন্দি ছিলেন।
বহরমপুর শহরে পুরাতন কান্দি বাস স্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত ব্রিটিশদের এই জেলটি 'কুখ্যাত' ছিল ভারতীয় বন্দীদের উপর অকথ্য নির্যাতনের জন্য। বর্তমানে ওই জেল ভবন এলাকায় গড়ে উঠেছে মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতাল।
ভারত স্বাধীন হওয়ার প্রায় দশ বছর পর ১৯৫৭ সাল নাগাদ সরকার এই জেলটি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু নকশাল আন্দোলনের সময় ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত বন্ধ জেলটি 'বিশেষ জেল' হিসেবে কেবলমাত্র নকশালদের বন্দিদের রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অনেকে দাবি করেন। ১৯৮০ সাল থেকে জেল ভবনটি মানসিক হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। তবে ২০০৪ সাল নাগাদ জেলের পুরনো ভবনগুলো বাদ দিয়ে ওই একই ক্যাম্পাসের মধ্যে মানসিক হাসপাতালের নতুন ভবন গড়ে উঠেছে।
তবে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না বহরমপুরে মানসিক হাসপাতালে কোন ঘরে সুভাষ এবং কাজী নজরুল ইসলাম বন্দি ছিলেন। অনেক ঐতিহাসিক দাবি করেন, জেলের মধ্যে সরস্বতী পুজো আসলে ছিল সুভাষচন্দ্র বসুর জাতীয় চেতনার প্রকাশ। শোনা যায় মন্দালায় (বর্তমান মায়ানমার) জেলে বন্দি থাকার সময় সুভাষচন্দ্র বসু অনশন এবং লড়াই করে ব্রিটিশ সরকারকে জেলের মধ্যে দুর্গাপুজো এবং সরস্বতী পুজো করার জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে বাধ্য করেছিলেন।
আজ যখন বাংলায় সরস্বতী পুজোর উৎসব চলছে তখন এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আনন্দের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে অনেক সংগ্রামের ইতিহাস।