• একটু দয়া করো মা গো বিদ্যে যেন হয়: রোশেনারা
    এই সময় | ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
  • রোশেনারা খান

    ছোটবেলায় সরস্বতী পুজোর মন্ত্র জানতাম না। জানার কথাও ছিল না। তবে আমাদের মুখে মুখে ফিরত সনৎ সিংহের এই গানটা- 'সরস্বতী বিদ্যেবতী, তোমায় দিলাম খোলা চিঠি/একটু দয়া কর মাগো বিদ্যে যেন হয়/এ সব কথা লিখছি তোমায় নালিশ করে নয়...।' আসলে স্কুলবেলায় এই পুজো আমাদের কাছে খুবই আনন্দের ও মজার ছিল। আমাদের প্রাইমারি স্কুলে সরস্বতী পুজো হতো একেবারেই অনাড়ম্বর ভাবে। স্কুলে তেমন একটা চাঁদা উঠত না। তবে কলাটা, মূলোটা চাইলেই পাওয়া যেত। জানি না কী ভাবে কালোপিসি পুজোর সব আয়োজন করতেন।

    আমরা স্নান সেরে সেজেগুজে স্কুলে হাজির হতাম। দেখতাম, চেয়ারের উপরে প্রতিমা রেখে গাছের ডাল-পাতা-ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। এক পাশে, কলাপাতায় নানা হরেক কিসিমের ফল কাটা রয়েছে। ধূপ জ্বলছে। পুরোহিতের পুজো শেষ হলে স্কুলঘরের সামনে আমরা সারি বেঁধে দাঁড়াতাম। প্রসাদ বিতরণ করতেন কালোপিসি। ওহ্, কালোপিসির পরিচয়টাই তো দেওয়া হয়নি। তাঁর আসল নাম ছিল কালোসোনা। এখানকার রাজ পরিবারের মেয়ে। তিনি বিধবা ও নিঃসন্তান ছিলেন। শুনেছি, তাঁরই অনুদানের টাকায় আমাদের স্কুলটি তৈরি হয়েছিল।

    পিসি ভাসানের দিনও চিড়ে-দইয়ের প্রসাদ দিতেন। সেই কবেকার কথা! মনে হয়, কালের স্রোতে সে সব দিন বুঝি ভেসে গিয়েছে। পঞ্চম শ্রেণিতে হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে দেখলাম, সেখানে সবকিছুই হাই। পুজোর আগের সন্ধ্যায় নবম ও দশম শ্রেণির দাদারা দুর্লভকাকার বাড়ি থেকে প্রতিমা নিয়ে আসত। নিজেরাই সাজাত। পরের দিন, অর্থাৎ পুজোর দিন সকাল থেকে এক দিকে চলত পুজোর আয়োজন। অন্য দিকে, খিচুড়ি, লুচি, বাঁধাকপির তরকারি, চাটনি তৈরি হতো। একটি নির্দিষ্ট সময়ে ছাত্রছাত্রীদের ডাকা হতো। তখন সবাই মিলে পুরোহিতের সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ করে পুষ্পাঞ্জলি দিতাম। তখন মানুষ অনেক উদার ছিলেন। সাম্প্রদায়িকতার বিষ এতটা মাথাচাড়া দেয়নি। সরস্বতী পুজোকে আমরা লেখাপড়ারই অঙ্গ ভাবতাম। সবাই অঞ্জলি দিতাম। এ সব বিষয়ে অভিভাবকরা মাথা ঘামাতেন না।

    বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে বসে প্রসাদের জন্য ফল কাটতাম। শেষ বার স্কুলের পুজোর কথা আজও মনে আছে। ১৯৭১ সাল। তখন একটু হলেও বড় হয়ে গিয়েছি। তাই নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, স্কুলে যাব না। কিন্তু সরস্বতী পুজোর দিন সকালে হঠাৎ আমাদের ক্লাসের দেবযানী এসে হাজির। বলল, 'এখনই চল। স্যর ডাকতে পাঠালেন। ঠাকুরের সামনে তোকে আলপনা দিতে হবে।' গিয়েছিলাম। ঠাকুরের সামনে চক দিয়ে আলপনা এঁকেছিলাম। এক দিদিও সাহায্য করেছিল। সে দিন খুব ভালো লেগেছিল। আনন্দ হয়েছিল আরও বেশি। পুজো উপলক্ষে স্কুলে নাটক হতো। প্যান্ডেল তৈরির জন্য বাড়ি থেকে ভালো শাড়ি নিয়ে যেতে হতো। সেই বাতাবরণ আজ আর খুঁজে পাই না।

    (মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

  • Link to this news (এই সময়)