সরস্বতী মূর্তি গড়ে লক্ষ্মী লাভ ঝাড়গ্রামের লক্ষ্মীর
বর্তমান | ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
প্রদীপ্ত দত্ত ,ঝাড়গ্ৰাম:কথায় বলে, সরস্বতীর সেবকরা নাকি লক্ষ্মীর কৃপা পান না! দু’বোনের নিত্য ঝগড়া থেকে সম্ভবত এমন কথার প্রচলন। কিন্তু, ঝাড়গ্রামে মৃৎশিল্পী লক্ষ্মীর দর্শন খানিক ভিন্ন। সরস্বতীর মূর্তি গড়েই লক্ষ্মীলাভের নজির গড়েছেন তিনি। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অপরূপ সরস্বতীকে স্কুলে, কলেজে মায় ঘরে নিয়ে যেতে প্রতিযোগিতা চলে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের। আসলে, ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধার হাতে এখনও সরস্বতীর গড়ন হয়ে ওঠে ভুবনমোহিনী।ঝাড়গ্রাম শহরের বাছুরডোবায় বাড়ি লক্ষ্মী দাসের। ছেলেবেলা থেকেই ঠাকুর গড়ার শখ ছিল তাঁর। বিয়ের পর সংসারের জোয়াল টেনেও মৃৎশিল্পী স্বামীর কাজে সাহায্য করতেন। ছ’বছর আগে মারা যান স্বামী। সংসারের হাল ধরতে শৈশবের শখকেই পুরোদমে পেশা করে তোলেন লক্ষ্মী। বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি গড়তে শুরু করেন। তবে, সরস্বতীর মূর্তি তাঁর হাতে হয়ে ওঠে অনন্য। বাঙালির বারো মাসে তেরো পাবনে ভালোই উপার্জন করেন। সরস্বতী পুজোয় অবশ্য লক্ষ্মীর লক্ষ্মী লাভ একটু বেশিই।জেলায় পুরুষ মৃৎশিল্পীদের রমারমা। সবার মধ্যে নিরন্তর প্রতিযোগিতা। তাঁদের মধ্যে লক্ষ্মীর জায়গা বেশ পাকাপোক্ত। বর্তমানে বয়সের ভারে কাজের ভার খুব বেশি বইতে পারেন না। ছেলে-মেয়ে ও নাতিকে প্রতিমা তৈরির কাজ শেখাচ্ছেন। নিজে অবশ্য শিখেছিলেন স্বামী কার্তিক দাসের কাছে। মৃৎশিল্পী হিসাবে ধীরে ধীরে লক্ষ্মীর পরিচয় বাড়ে।মূর্তি তৈরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কাজই নিজ হাতেই সামলান লক্ষ্মী। বৈতা এলাকা থেকে মাটি আনতে হয়। ঘোরাধরা এলাকা থেকে বাঁশ, বাতা, কাঠ আসে। কলকাতার বাজার থেকে শাড়ি, শোলার গয়না কিনে আনেন। আজ, সরস্বতী পুজো। ঝাড়গ্ৰামে আদিবাসী মার্কেটে শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত লক্ষ্মী। সহযোগিতা করছে মেয়ে ও নাতি। এবার পঞ্চান্নটি সরস্বতী মূর্তি তৈরি করেছেন। সাতটি ছাড়া সব বিক্রি হয়ে গিয়েছে। লক্ষ্মী বলছিলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যেই বাকি সরস্বতী প্রতিমা বিক্রি হয়ে যাবে। বয়সের কারণে নিজের হাতে এখন সব কাজ করতে পারি না। তবে রঙ করা, শাড়ি ও গয়না পরানোর কাজ এখনও নিজের হাতেই করি। সারাবছর ধরেই নানা পুজো-পার্বণ চলে। লক্ষ্মী, গণেশ, অষ্টপ্রহরের জন্য রাধা, কৃষ্ণ, গৌর, নিতাই, মা শীতলা, মনসার মূর্তি গড়ি। স্বামী হাত ধরে মূর্তি বানানো শিখিয়েছিল। সেই কাজ করেই এখন সংসার চালাচ্ছি।’মায়ের মুখের কথায় থাবা বসিয়ে মেয়ে সন্ধ্যা বসু বলছিলেন, ‘মায়ের কাছেই মূর্তিতে শাড়ি, গয়না পরানো শিখেছি। পুজোর মরশুমে মা’কে সাহায্য করি। মা এই বয়সেও মূর্তি তৈরির যাবতীয় কাজ নিজের হাতে করেন। এক একটা মূর্তির দাম তিন হাজার থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা। বিক্রি ভালোই হচ্ছে।’ গোপীবল্লভপুর-২ ব্লকের মহাপাল শ্রী বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক প্রভাত কুমার রাউতের কথায়, ‘স্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে আদিবাসী মার্কেট মূর্তি কিনতে এসেছিলাম। লক্ষ্মী দাসের কাছে মূর্তি কিনেছি। বাণী বন্দনায় লক্ষ্মীর কাছ থেকে মূর্তি কেনা আমাদের সৌভাগ্য। এটাও এক ধরনের দেবীবন্দনা।’ নিজস্ব চিত্র