তামিম ইসলাম , ডোমকল:শুনানির নোটিশ পেয়ে আড়াই মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে বৃহস্পতিবার ডোমকলের একটি শুনানি কেন্দ্রে হাজির হয়েছিলেন নার্গিসা খাতুন (নাম পরিবর্তিত)। লাইনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে খিদে পায় শিশুটির। কুঁকিয়ে কেঁদে ওঠে। আড়ালে গিয়ে বুকের একটু দুধ খাওয়াবেন, এমন জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই অফিস চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির আড়ালে স্তন্যপান করান শিশুটিকে।নার্গিসা উদাহরণ মাত্র। শুনানিতে এসে প্রতিদিনই এই একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রসূতি মায়েদের। কেউ গাড়ির আড়ালে, কেউ গাছের নীচে, কেউ আবার বাধ্য হয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে সন্তানকে দুগ্ধ পান করাচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই দাবি উঠেছে, শুনানি মাতৃদুগ্ধ পান করানোর জায়গা তৈরি করা হোক। যেখানে অন্তত কোলের ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না থামানো যায়।সম্পূর্ণ ‘বিশুদ্ধ’ ভোটার তালিকা নির্মাণে গণহারে শুনানির নোটিশ পাঠাচ্ছে কমিশন। সামান্য ভুলচুক হলেও ক্ষমা নেই। এনিয়ে নতুন একটি শব্ধ বন্ধ মুখে মুখে ঘুরছে। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’। করোনা মহামারী কালে যেমন ঘুরছিল—‘সোশ্যাল ডিসটেন্স’। দু’টি শব্ধবন্ধের ফলাফল একই—দুর্ভোগ। আর এই দুর্ভোগ পোয়াতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ থেকে বিএলও কিংবা প্রশাসনের পদস্থ কর্তাদের। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে প্রসূতি মায়েদের। বেশ কয়েকদিন ধরে শুনানি কেন্দ্রগুলিতে তাঁদের সমস্যা বেশ জ্বলন্ত। দেখা যাচ্ছে, অন্যান্যদের সঙ্গে কোলে সন্তান নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে মায়েরা। খিদের চোটে শিশুটি কান্নাকাটি জুড়ে দিলে মায়েদের মনটাও অস্থির হয়ে ওঠে। একটু নিভৃত জায়গার খোঁজে মাথা কুটতে থাকেন। মহকুমার প্রায় কোনও শুনানি কেন্দ্রেই আলাদা করে কোনও স্তন্যপান কক্ষ নেই।কয়েক বছর আগে ডোমকল মহকুমার কয়েকটি বিডিও অফিসে ‘ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার’ তৈরি হয়েছিল। সেগুলিও এখন অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসআইআরে শুনানি পর্ব শুরু হতেই সেই সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা খুব করে দেখা দিয়েছে। কিন্তু, প্রশাসনের তরফে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ। শুনানিতে হাজিরা দেওয়া এক প্রসূতি মা বলছিলেন, ‘অফিসের বাবুরা কি আর আমাদের সমস্যা বোঝেন? বুঝলে অন্তত আমাদের বাচ্চাদের দুধ খাওয়ানোর জন্য একটা আলাদা জায়গার ব্যবস্থা করতেন। এত মানুষের মাঝে এভাবে দুধ খাওয়াতে গিয়ে কি যে বিব্রতবোধ করতে হয়, সেটা শুধু আমরাই বুঝি।’ডোমকল গার্লস কলেজের সমাজতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রিয়ঙ্কর দাস বলছিলেন, ‘এসআইআর কতটা অপরিকল্পিত, তার ছাপ মিলছে শুনানির লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের ভোগান্তিতে। শুনানিতে ডাকা হলেও প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পরিষেবা দিতে পারছে না কমিশন। সেই কারণে মায়েদের কখনও গাড়ির আড়ালে, কখনও ওয়াশরুমে গিয়ে সন্তানকে দুধ খাওয়াতে হচ্ছে। কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও প্রসূতি মায়েদের জন্য একটি স্তন্যপান কক্ষের ব্যবস্থাও করা হয়নি। এটি আমাদের দেশের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই প্রতিফলন।’ডোমকলের এসডিও শুভঙ্কর বালা অবশ্য বলেন, ‘সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রসূতি মা কিংবা অন্য কেউ শুনানিতে আসতে না পারলে তাঁদের অথরাইজড কোনও ব্যক্তি শুনানিতে অংশ নিতে পারেন। ফলে, প্রসূতি মায়েদের শুনানি কেন্দ্রে আসতেই হবে, এমনটা নয়। তবে, বিষয়টি আমরা দেখছি। যাতে নিয়ম মাফিক যেটা থাকার কথা, সেটার ব্যবস্থা করা যায়।’ প্রতীকী চিত্র