স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: চালক সহ স্কুটারের আরোহীর সংখ্যা তিন। কারও মাথায় হেলমেটের বালাই নেই। আবার সিগন্যাল ‘লাল’ থাকলেও তাতে বিন্দুমাত্র চক্ষুপাত না করে সটান এগিয়ে যাচ্ছেন দ্বিচক্র যান চালকরা। খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ, পার্ক সার্কাসে এই দৃশ্য অহরহ। কিন্তু, লালবাজারের সমীক্ষা বলছে, শুধুমাত্র এই সমস্ত এলাকাই নয়, শহরের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে হামেশাই সিগনাল মানছেন না যান চালকরা। তার জেরে হামেশাই ঘটছে পথদুর্ঘটনা। ছোটোখাটো দুর্ঘটনা তো লেগেই থাকছে। চিহ্নিত ক্রসিংগুলির মধ্যে গত ২০২৫ সালে তিনটিতে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও ঘটেছে সিগনাল অমান্যের জেরে। এই সমীক্ষার রিপোর্ট জমার পরই অভিনব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে লালবাজার। শহরের গুরুত্বপূর্ণ ২০টি মোড়কে ‘সিগন্যাল ভায়োলেটেড ক্রসিং’ বলে চিহ্নিত করেছে লালবাজার।কলকাতা পুলিশের দাবি, স্থানীয় বাসিন্দারাই বেশি সিগন্যাল অমান্যের বেপরোয়াভাব দেখাচ্ছেন। অনেকবার পুলিশ তাঁদের ‘নরম’ সুরে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। তাতেও হাল ফেরেনি। তাই এবার জরিমানার পথে হাঁটছে লালবাজার। চিহ্নিত ২০টি ক্রসিংয়ে বসছে রেড লাইট ভায়োলেশন ক্যামেরা। যে কোনও গাড়ি লাল সিগন্যাল অমান্য করলেই সংশ্লিষ্ট যানের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রুজু হবে ট্রাফিক মামলা। গুণতে হবে ন্যূনতম ১০০০ টাকা। ট্রাফিক বিভাগ সূত্রের খবর, প্রায় আড়াই কোটি টাকা খরচে এই ক্যামেরাগুলি ইনস্টল করা হবে। তবে কোন কোন ক্রসিংয়ে এই ক্যামেরা ইনস্টল হবে, তা প্রকাশ করতে নারাজ পুলিশ। সূত্রের খবর, খিদিরপুর মোড়ে এই ক্যামেরা বসতে পারে। একইসঙ্গে, কোয়েস্ট মলের সামনের ক্রসিং, যাদবপুরের সুলেখা মোড়, বাঘাযতীনে মোড়েও এই অত্যাধুনিক ক্যামেরা বসানো হতে পারে।কীভাবে কাজ করবে রেড লাইট ভায়োলেশন ক্যামেরা বা আরএলভিডি ক্যামেরা? ট্রাফিক বিভাগ জানাচ্ছে, যে কোনও ক্রসিংয়ে দু’টি সিগন্যাল পোস্ট থাকে। প্রথমটিকে বলা হয়— প্রাইমারি সিগন্যাল পোস্ট। দ্বিতীয়টিকে সেকেন্ডারি সিগন্যাল পোস্ট বলা হয়। দু’টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০ মিটারের ব্যবধান থাকে (মোড় বিশেষে পৃথক)। কোনও চালক সিগন্যাল ‘লাল’ হওয়া সত্ত্বেও অমান্য করে ‘প্রাইমারি’ সিগন্যাল পোস্ট পার করলেই রেড লাইট ভায়োলেশন ক্যামেরার নজরবন্দি হবে। এই ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত থাকে অটোমেটিক নম্বরপ্লেট রেকগনিশন (এএনপিআর) প্রযুক্তি। যৌথ প্রযুক্তিতে কাজ করে আরএলভিডি। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সিগন্যাল লঙ্ঘন করলেই সঙ্গে সঙ্গে আরএলভিডি ক্যামেরায় উঠে যাবে বিধিভঙ্গকারী গাড়ির ছবি, নম্বরপ্লেট, লোকেশন। নম্বরপ্লেটটিকে শনাক্ত করবে এএনপিআর প্রযুক্তি। এরপরে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে লালবাজারের সার্ভারে চলে যাবে নম্বরপ্লেট ও বিধিভঙ্গের সময়ের ছবি। মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই নম্বরপ্লেটটি যে মোবাইল নম্বরে রেজিস্টার্ড, তাতে চলে যাবে জরিমানার মেসেজ। শুধু তাই নয়, মামলার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ট্রাফিক বিধিভঙ্গের সময়ের সেই ছবিটিও চলে আসবে গাড়ির মালিকের মোবাইলে। কলকাতা পুলিশের অ্যাপ বা পোর্টাল থেকেই জরিমানার টাকা জমা করতে পারবেন বেপরোয়া চালক বা গাড়ির মালিক। লালবাজার ট্রাফিক বিভাগের এক আধিকারিক বলেন, মোট দুর্ঘটনার প্রায় ১৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই কারণ—সিগন্যাল অমান্য। তার জেরেই শহরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর পয়েন্টে আরএলভিডি ক্যামেরা ইনস্টলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।