• স্বপ্নাদেশ পেয়ে শ্বেতপাথরের প্রতিমা, প্রসাদে থালার মাপের বাতাসা, শতাব্দীপ্রাচীন সরস্বতী মন্দিরে হাতেখড়ির ভিড়
    বর্তমান | ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
  • কলহার মুখোপাধ্যায় ও সুদীপ্ত কুণ্ডু, কলকাতা ও হাওড়া: প্রেমেন্দ্রনাথ মিত্র হলে বলতেন, গলির পর গলি তস্য গলি। অঞ্জন দত্ত হলে বলতেন, অলিগলি পাকস্থলী। হাওড়ায় সেরকমই একটি তস্য গলিতে ঢুকে হাঁটলে বাড়িগুলির ছাদের ফাঁক দিয়ে আচমকা চোখে পড়ে মন্দিরের হলুদ রঙের চূড়া। চমক লাগে যখন দেখা যায় চূড়ায় খোদাই করা হাঁস। বীণাও আছে। এরকম চূড়া তো সরস্বতী মন্দিরে থাকার কথা! এ মন্দির কি তাহলে দেবী সরস্বতীর? অনুমান সঠিক। হাওড়ার পঞ্চাননতলায় রয়েছে একটি মন্দির, যেটি দেবী সরস্বতীর। সেটির বয়স ১০০ বছর ছাড়িয়েছে।সরস্বতী বিদ্যার দেবী। হিন্দু বাঙালি ঘরের শিশুদের পড়াশোনা সরস্বতী ছাড়া শুরু হয় না। অল্প বয়সে দেবীর সামনে হাতেখড়ি। তারপর লেখাপড়া শিখতে শুরু করে বাচ্চারা। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে বাংলার ঘরে ঘরে তাঁর পুজো হয়। কিন্তু সরস্বতীর মন্দির খুব একটা চোখে পড়ে না। বাংলাতে তো নয়ই। ভারতেও রয়েছে হাতেগোনা। সেই জায়গায় ব্যতিক্রম হাওড়ার মন্দিরটি।হাওড়া ময়দান থেকে হেঁটে চলে যাওয়া যায় পঞ্চাননতলায়। বাস রাস্তা ধরে মিনিট চার-পাঁচেক হাঁটলে থ্যালাসেমিয়া হাসপাতাল, তার উল্টোদিকের গলিটিই হল সেই তস্য গলি। সেটির নাম উমেশচন্দ্র দাস লেন। তা ধরে একটু হাঁটলেই চোখে পড়ে বীণা-হাঁস খোদিত উজ্জ্বল হলুদ রঙের চূড়াটি। এই মন্দির তৈরির গল্পটি বেশ সাধারণ। আবার অসাধারণও বটে। কোনও কিংবদন্তি নেই। স্বপ্নাদেশ নেই। কল্পকথা-গল্পকথা নেই। কিন্তু শত বছর আগের যে ইতিহাস যতটুকু জানা যায়, তা বেশ মেদুর। শুনলে শ্রদ্ধা হয়। ভক্তি হয়।গলিটি যাঁর নামে সেই উমেশচন্দ্র ছিলেন শিক্ষাবিদ। সে যুগের বিখ্যাত মানুষ তিনি। সরস্বতীর মন্দির তৈরির ইচ্ছা তাঁর ছিল। তাঁর এক পুত্র রণেন্দ্রনাথ দাস পেশায় ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। একবার কাজে রাজস্থান যান। তারপর মায়ের নির্দেশে সেখান থেকে একটি শ্বেতপাথরের সরস্বতী কিনে আনেন। এই কথাটি মন্দিরের একটি ফলকে লেখা রয়েছে কবিতার আকারে। তারিখ লেখা, ১৯১৯ সাল। ২০ মার্চ। তারপর মন্দির তৈরি শুরু। কয়েকবছর সময় লেগেছে। আনুমানিক ১৯২৩ সাল নাগাদ কাজ শেষ হয়। তারপর থেকে হলুদ রঙের মাথাটি উঁচু করে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে মন্দিরের চূড়া। মন্দিরের দায়িত্ব এখন সামলাচ্ছেন আলপনা দাস ও তাঁর পুত্ররা। আলপনাদেবীই জানালেন, দেবীর ভোগের বাতাসার কথা। বড়ো আকারের বাতাসা দিতেই হয় সরস্বতীকে। সঙ্গে ১০৮ মালসায় ফল, মিষ্টি ইত্যাদি অন্যান্য ভোগ।সরস্বতী পুজোর দিন মানে আজ নিজেদের সন্তানকে নিয়ে অনেক মা-বাবা আসবেন হাতেখড়ি দেওয়াতে। বিদ্যার দেবীর সামনে শিশুরা হাতে পেন-পেন্সিল তুলে নেবে। তাদের হাতেই ভবিষ্যতের ভার ছাড়ব আমরা, বড়োরা। শিশুরাই শিক্ষার আলো ছড়াবে জগৎ সংসারের উপর। ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোহস্তু তে...’ পুজোর সময় মন্ত্র বলতে বলা হবে বাচ্চাদের। তারা এত শক্ত উচ্চারণ পারবে না। আধো আধো স্বরে বলবে, ‘বিদ্দে দাও, বুদ্দি দাও ঠাকুর।’ তাদের উচ্চারণে পবিত্র হয়ে উঠবে সরস্বতী পুজোর সকাল। তাদের বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি-শাড়ির ঔজ্জ্বল্যে আরও ঝলমলে হয়ে উঠবে মন্দিরের হলুদ চূড়া। বিদ্যার আলোয় সকল অন্ধকার মিটিয়ে দাও ঠাকুর। সরস্বতী নম নম। -নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)