এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে দুই ২৪ পরগনায় বিতর্ক, ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ, ছয় সন্তান! নোটিস ২ লক্ষকে
বর্তমান | ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: একটা সময় বড়ো সংসার ছিল গ্রামবাংলার চেনা ছবি। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে রাষ্ট্রের চোখও! এসআইআর পর্বে উত্তর ২৪ পরগনায় এখন সেই বড়ো সংসার হয়ে উঠেছে সন্দেহের কারণ। ছ’জনের বেশি সন্তানের জন্ম দেওয়া নির্বাচন কমিশনের নথিতে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ভোটার হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে। হাজার হাজার পরিবারের কর্তা সহ সদস্যদের দাঁড়াতে হচ্ছে শুনানির লাইনে। সন্তানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় দু’লক্ষ ভোটার এখন সন্দেহের তালিকায়। তাঁদের নোটিস পাঠাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকায় যাঁকে বাবা হিসাবে দেখানো হয়েছে, তিনি প্রকৃত বাবা কি না তা নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে।জেলা নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ছ’জন বা তার বেশি সন্তানের ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা ম্যাপিংয়ে অসঙ্গতির সম্ভাবনা বেশি। একজনকে পিতা দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত করার অভিযোগের ভিত্তিতেই এই শ্রেণির ভোটারদের আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে। দপ্তরের যুক্তি, অবৈধ ভোটার চিহ্নিত করতে এই বাড়তি যাচাই প্রয়োজন। তবে, স্থানীয় স্তরে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন অনেকেই। তাঁদের দাবি, অবৈধ ভোটার ধরার নামে বৈধ ভোটারদের সম্মানহানি করা হচ্ছে! আর এতে রেহাই মিলছে না বিএলও-দেরও। ছ’জন বা তার বেশি ভাই থাকলেই বিএলওদের কাছেও এসআইআর নোটিস পৌঁছচ্ছে। ফলে নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ২ লক্ষ ২ হাজার ২০২ জন নোটিস পেয়েছেন। আর এই ধরনের ভোটার বেশি বনগাঁ ও বসিরহাট মহকুমায়। বারাসত ২ ব্লকে শুনানিতে এসেছিলেন ষাটোর্ধ্ব সাদাইত খাঁন। তাঁর বাড়ি কেমিয়া-খামারপাড়ায়। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর বলেন, নোটিসে বলা আছে বাবার নামে সমস্যা। আমরা চার ভাই ও তিন বোন। প্রত্যেককেই ডাকা হয়েছে। অন্যদিকে, বারাসতের ছোটো জাগুলিয়া শুনানি কেন্দ্রে এসে বারাসত শহরের বনমালীপুরের বাসিন্দা রূপা চক্রবর্তী বলেন, বাবার নামের সঙ্গে গণ্ডগোলের কারণে আসা।বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। তৃণমূল বিধায়ক নারায়ণ গোস্বামী বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের আড়ালে সাধারণ মানুষকে পরিকল্পনা করে হয়রান করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট অংশকে টার্গেট করা হচ্ছে। বিজেপি নেতা তাপস মিত্র বলেন, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশন নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বানানে ‘ই’-কার, ‘ঈ’-কারের, ভুল, শুনানির লাইনে ভোটার!সৌম্যজিৎ সাহা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নামের বানানে ‘ই’ ছিল, কিন্তু ইনিউমারেশন ফর্মে তা ‘ঈ’ হয়ে গিয়েছে। এটাই নাকি ভোটারের মস্ত বড়ো ভুল! ফলে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে ডেকে পাঠানো হয়েছে শুনানিতে। আবার ২০০২-এর তালিকায় কোনো ভোটারের মোল্লা বানান যা লেখা রয়েছে, সেটাই এবার এআই অন্যভাবে লিখেছে। তাতেও রেহাই নেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। এমনই সব তুচ্ছ অসঙ্গতির কারণে শুনানির লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে ভোটারদের। প্রযুক্তির ভুলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনানির লাইনে অপেক্ষা করছেন অসংখ্য মানুষ। তাঁদের মধ্যে বহু দিন আনা দিন খাওয়া মানুষও আছেন। নির্বাচন কমিশনের এহেন কীর্তিতে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছে ভোটারদের মধ্যে। এই সমস্যা সবথেকে বেশি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সংখ্যালঘু প্রধান ব্লক বা বিধানসভা কেন্দ্রে।সূত্রের খবর, সেখানে মোট ভোটারের প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশকে ডাকা হয়েছে শুনানিতে। ক্যানিং পূর্ব, ভাঙড়, মগরাহাট পূর্ব, মগরাহাট পশ্চিম, মেটিয়াবুরুজ প্রভৃতি এলাকায় কোথাও ৯১ হাজার ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে, কোথাও আবার ডাক পেয়েছেন ৭৫ হাজার। ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ লক্ষ ৯২ হাজারের মতো। তার মধ্যে শুনানিতে ডাক পেয়েছেন প্রায় ৮৭ হাজার। মেটিয়াবুরুজ বিধানসভায় ডাক পড়েছে ১ লক্ষ ৫ হাজারের! এখানে মোট ভোটার ২ লক্ষ ২০ হাজার। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক ভোটারকেই শুনানির লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এছাড়াও এমন অনেক বুথ আছে, যেখানে সিংহভাগ ভোটারকে এখন প্রমাণ করতে হচ্ছে, কোন বানান ঠিক, কোনটা ভুল।উদাহরণ দিয়ে এক আধিকারিক বলেন, ভাঙড়ে আগের তালিকায় দোধিরাম দাসের নাম ছিল। কিন্তু ইনিউমারেশন ফর্মে তা দোধীরাম হয়ে গিয়েছে। ‘ই’-কার ‘ঈ’ হতেই ডাক পড়েছে তাঁর। কোথাও আবার ‘য’ ফলা, ‘আ’, ‘ই’-র এদিক ওদিকের জন্যও অনেককে নোটিস ধরানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের শুনানি করতে লাগছে বিস্তর সময়। সামান্য ত্রুটি ঠিক করতে হয়ত কয়েক সেকেন্ড লাগছে। কিন্তু সেই দু’-চার সেকেন্ডের জন্যই এক-একজনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিতে হচ্ছে। ভাঙড়ের সিপিএম নেতা তুষার ঘোষ বলেন, চরম হয়রানি করা হচ্ছে মানুষকে। নির্বাচন কমিশনের তুঘলকিপনার কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ভীষণ ক্ষিপ্ত। ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক শওকত মোল্লাও কমিশনের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ। অযথা মানুষকে হয়রানির জন্য বিজেপি ও কমিশনকেই দায়ী করেছেন তিনি।