এই সময়: উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়া, ইটাহার বা মুর্শিদাবাদের ফরাক্কার ছবি ফিরবে না তো স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) হিয়ারিংয়ের অন্তিম পর্যায়ে? এটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা দেশের নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির তালিকা প্রকাশ ও শুনানি প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে পার করার ইস্যুতে রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসনের উপরেও কমিশন ক্রমাগত চাপ বাড়াচ্ছে। আইন–শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে তৈরি হচ্ছে সংঘাতের পরিস্থিতিও। অসঙ্গতির তালিকা প্রকাশের আগে তাই কমিশন ফের চাপ তৈরি করল ফরাক্কার বিডিও অফিসে ভাঙচুরের ঘটনায় তৃণমূল বিধায়ক মণিরুল ইসলাম ও ইটাহারের গোলমালে বিধায়ক মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের নির্দেশ দিয়ে।
গত ১৪ জানুয়ারি ‘সার’–এর হিয়ারিং চলাকালীন ফরাক্কার বিডিও অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় উত্তেজিত জনতা। সেই ঘটনায় পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয়ের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছিল। বৃহস্পতিবার মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিককে (ডিইও) কমিশন নির্দেশ দিয়েছে, যে হেতু ওই দিনের ঘটনায় মণিরুল ঘটনাস্থলে থেকে গোলমালে ইন্ধন দিয়েছিলেন এবং তারপরেও তিনি প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন কমিশনের আধিকারিকদের উদ্দেশে, তাই তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করতে হবে। এ দিনই আবার উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারে স্ত্রীর নামে ‘সার’–এর নোটিস আসায় আতঙ্কে স্বামী আত্মঘাতী হয়েছেন, এই অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। শুনানি কেন্দ্রে ব্যাপক ভাঙচুর চলে। এইআরও–সহ সেখানকার কর্মীদের মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ। পরে স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক মোশারফ হোসেনের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা মৃতদেহ নিয়ে ইটাহার চৌরাস্তায় ১২ নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন।
এই ঘটনায় মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধেও এফআইআর করে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে ডিইও–কে। মোশারফ বলেন, ‘বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে নির্বাচন কমিশনের অত্যাচারেই ওই ব্যক্তি আতঙ্কে আত্মঘাতী হয়েছেন। তাই মানুষ বিক্ষোভ দেখিয়েছেন।’ ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশের আগেই রাজ্যের শাসকদলের দু’জন বিধায়কের বিরুদ্ধে কমিশনের এফআইআর দায়েরের নির্দেশকে বেনজির বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশ। বিকেল ৫টার মধ্যে এফআইআর করার নির্দেশ থাকলেও এ দিন রাত ৯টা পর্যন্ত মণিরুলের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়নি বলে খবর। অন্য দিকে, রায়গঞ্জ পুলিশ জেলার এসপি সোনাওয়ানে কুলদীপ সুরেশ বলেন, ‘ব্লক প্রশাসনের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।’ঠিক এই আবহে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকা প্রকাশ এবং তার ১০ দিন পর থেকে হিয়ারিংয়ের শেষ পর্যায়কে শান্তিপূর্ণ করতে মরিয়া কমিশন।
গত সোমবার সু্প্রিম কোর্টের নির্দেশ উল্লেখ করে তাই রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি ও কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে কমিশন লিখিত ভাবে জানিয়েছে, লিস্ট প্রকাশ ও হিয়ারিং প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সারতে পর্যাপ্ত কর্মী এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। এর কোনও ব্যতিক্রম হলে কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ, জেলা পুলিশ বা প্রশাসনের আধিকারিকদের বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেবে। বস্তুত, এ দিন সন্ধেয় ডিইও–দের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল এই বিষয়টিই ফের স্পষ্ট করে দিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। এখানে কমিশন ও রাজ্য প্রশাসন— উভয়ের কাছেই বড় চিন্তার বিষয় হলো, যে ভোটাররা হিয়ারিং নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন, তাঁরা অন্তত শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভাবে শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন কি না। সুপ্রিম–নির্দেশ মেনে কমিশন জানিয়েছে, প্রতিটি বুথ, ওয়ার্ড, ব্লক ও পঞ্চায়েত অফিসে ‘ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকা টাঙানো হবে শনিবারের মধ্যে।
তারপরে ১০দিন ধরে কোথায় কোথায় নথি জমা দেওয়ার কাউন্টার হবে এবং হিয়ারিং কোথায় হবে, তা ডিইও–রা জানাবেন কমিশনকে। ‘ডিসক্রিপেন্সি’ (সংখ্যাটা এখন ৯৪ লক্ষ ৪৯ হাজার) ও ‘আনম্যাপড’ (সংখ্যাটা প্রায় ৩২ লক্ষ) মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩২ লক্ষের মতো ভোটারের তালিকা প্রকাশ হলেই উদ্বিগ্ন লোকজন সেখানে ভিড় করবেন। তারপরে তাঁদের নথি জমা দিতে হবে, সশরীর হাজিরা দিতে হবে হিয়ারিংয়ে। এবং সময় যত এগোবে, সাধারণ মানুষের এই দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে স্বাভাবিক ভাবেই। চাকুলিয়া, ইটাহার বা ফরাক্কার মতো ঘটনা এড়াতে তাই প্রতিটি শুনানি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত কর্মী ও পুলিশ রাখার ব্যাপারে কমিশন নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য প্রশাসনকে। ভোটের আগেই এত সংখ্যায় পুলিশ ও কর্মী দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় নবান্নের কর্তারাও। কারণ, গোটা প্রক্রিয়ার উপরে নজর রয়েছে সুপ্রিম কোর্টেরও।
ফরাক্কার ঘটনায় শুধু ভাঙচুর নয়, বিডিও-কে লক্ষ্য করে চেয়ারও ছোড়া হয়। ফরাক্কার বিডিও জুনায়েদ আহমেদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মোট ছ’জনকে গ্রেপ্তার করে। এ দিন তাঁরা জামিন পেতেই তাঁদের গলায় মালা পরিয়ে ‘বীরের সংবর্ধনা’ দেওয়া হয়। এ নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও চলছে। তবে এ সবকে ছাপিয়ে গিয়েছে কমিশন সরাসরি বিধায়ক মণিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এফআইআরের নির্দেশ দেওয়ায়। ওই ঘটনার পরেও একটি ভাইরাল ভিডিয়োয় (যার সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময়’) মণিরুলকে হুমকি দিতে শোনা যায়, ‘কঞ্চির ঝান্ডা চলবে না, লাঠি দিয়ে ঝান্ডা বাঁধতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কোমর ঢিলা করে দিতে হবে।’ এরপরে এ দিন কমিশন মুর্শিদাবাদের ডিইও–কে জানিয়ে দেয়, মণিরুলের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে হবে। মণিরুল অবশ্য বলেন, ‘মানুষের ভোটে জয়ী হয়ে আমি বিধায়ক হয়েছি। মানুষ হয়রান হলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি সেখানে আমি যাব। এখন নির্বাচন কমিশন প্রশাসনকে কী নির্দেশ দিয়েছে আর সেই নির্দেশ মেনে প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ করেছে কি না, আমার জানা নেই। প্রশাসন পদক্ষেপ করুক। তার পরে এ নিয়ে যা বলার বলব।’
‘ডিসক্রিপেন্সি’র লিস্ট প্রকাশের আগে এমন একের পর এক হাঙ্গামার ঘটনায় উদ্বিগ্ন কমিশন। এখনও পর্যন্ত হিয়ারিং যত দূর হয়েছে, তাতে কমিশনের মতে, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, দুই মেদিনীপুরের কিছু অংশ, হুগলি ও বাঁকুড়ার কিছু অংশ অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গায় রয়েছে। সেখানে গত এক মাসে ‘সার’কে কেন্দ্র করে একাধিক গোলমাল, ভাঙচুর, হিংসার ঘটনা ঘটেছে। সেই সব জায়গায় বেশি কর্মী নিয়োগ করে শুনানির দুর্ভোগ মেটাতে চায় কমিশন। এই মুহূর্তে ২৯৪ জন ইআরও ছাড়াও সাড়ে সাত হাজার এইআরও এবং অতিরিক্ত এইআরও কাজ করছেন। ৮ হাজার মাইক্রো অবজ়ারর্ভার রয়েছে। শুনানির ভিড় কমাতে আরও দেড় হাজার অতিরিক্ত এইআরও নিয়োগ হতে চলেছে বলে খবর। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকছেই।
এফআইআরের প্রসঙ্গ নিয়ে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘এ রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলে মণিরুলের বাড়িতে বুলডোজ়ার চালানো হতো। বিজেপি ক্ষমতায় এসে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে।’ পাল্টা তৃণমূল মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তীর মন্তব্য, ‘মণিরুলকে কোথাও মারপিট করতে দেখা যায়নি। উনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এটা ঠিক। তবে মানুষের ক্ষোভ ন্যায়সঙ্গত। যদিও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ কখনও সরকারি অফিস ভাঙচুর হতে পারে না। মণিরুলের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী উস্কানিমূলক মন্তব্য করলেও ওই একই কমিশন সে বিষয়ে নীরব।’
‘সার’ নিয়ে এই অসন্তোষের পিছনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য কমিশনকেই দায়ী করছেন। এ দিন কলকাতা বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মমতা বলেন, ‘আগে ইলেকশন কমিশন নয়, জনগণ নির্ধারণ করতেন, কে ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু এখন ভোটের আগেই কমিশন ঠিক করে দিচ্ছেন কাকে নিয়ে আসতে হবে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে। এটা হতে পারে না। সবাই এর প্রতিবাদ করবেন। মনে রাখবেন, আমার ঘরে আগুন লাগেনি, পাশের বাড়িতে লেগেছে বলে আমি চুপ থাকতে পারি না।’ যদিও রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘আমরা পরিষ্কার বলছি, নো এসআইআর, নো ভোট। তৃণমূলের ঘোষিত নীতিই হলো, তারা বাংলায় সার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে হতে দেবে না। বাংলাদেশি রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকায় রেখেই তারা নির্বাচনে যেতে চায়। স্পষ্ট ভাষায় বলছি, এসআইআর প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠু ভাবে হতে দিতে হবে। তার জন্য নির্বাচন কমিশনকে যা করার করতে হবে।’