• শহরের হৃদয়দীপে বানুর স্পর্শ সাহিত্য উৎসবে
    আনন্দবাজার | ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
  • ‘কলকাতা লিটারারি মিট’ উদ্বোধনের পরে তাঁর বইয়ে সই নিতে দীর্ঘ লাইন পড়ল আলিপুর জেল মিউজ়িয়ামের মাঠে। উদ্বেল এক পাঠক বললেন, ২০২৫-এ ভারতীয় হিসেবে সব চেয়ে আনন্দ আপনার পুরস্কার জয়েই পেয়েছি। ‘হার্টল্যাম্প’ গল্প সঙ্কলনের জন্য আন্তর্জাতিক বুকারজয়ী বানু মুশতাক এ ভাবেই এ শহরের হৃদয়দীপ স্পর্শ করলেন।

    বহুস্বরা ভারতের অন্যতম প্রতীক বানু এই প্রথম কলকাতায় এলেন। আর ঝুম্পা লাহিড়ী এক যুগ বাদে তাঁর শিকড়ের কাছে ফিরলেন। সাহিত্য উৎসবের উদ্বোধনে বহু স্বাধীনতা-সংগ্রামী থেকে নকশাল বন্দির ইতিহাসবাহী আলিপুর জেল মিউজ়িয়ামে মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’-এর কিছুটা বাংলায়, ইংরেজিতে পড়া হয়েছে। বানুর সঙ্গে আর এক যশস্বিনী, পুলিৎজ়ারজয়ী বারবারা কিংসল্ভার উৎসবের সূচনা করেন। এই দু’জন লেখিকার যত অমিল, ততটাই মিল, বলছিলেন উৎসবের কিউরেটর মালবিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘কন্নড়ে লেখা বানুর মফস্‌সলি জীবনের ছোট ছোট আশা-ভয়ের পাশে বারবারার উপন্যাসের ক্যানভাস অনেক বড় মনে হতে পারে। তবু এ গ্রহের প্রতি দরদে, প্রান্তিকদের প্রতি সহমর্মিতায় দু’জনেই এক।’’

    একটু বাদে কলকাতা প্রসঙ্গে বানু বলবেন, ‘‘এ শহর এক অদ্ভুত শহর, যেখানে শব্দ নিছক কথার কথা নয়, জীবন বদলানোর জোর রাখে। কলকাতায় শব্দ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছে, আর ক্ষতবিক্ষত সভ্যতার বাণী বয়ে এনেছে।’’ আগে কখনও কলকাতায় না-এলেও বানু তাঁর জীবনে বাংলা এবং রুশ সাহিত্যের গভীর প্রভাবের কথা বলছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবীদের পড়ার কথা এবং এখনও পড়ে চলার কথা বলেন তিনি। আর বারবারা বললেন, ‘‘আমার পড়া নানা বইয়ের সুবাদে কলকাতাকে কত দিনের চেনা মনে হয়।’’

    উৎসবের প্রথম দিনে ঝুম্পা তাঁর নতুন ভালবাসার ভাষা ইটালিয়ানে লেখা গল্প সঙ্কলন ‘রোম্যান স্টোরিজ়’ নিয়ে কথা বলেছেন মালবিকার সঙ্গে। বইটি ইংরেজিতেও তর্জমা হয়েছে। প্রকাশকদের ছোট গল্প নিয়ে আপত্তির কথা বলছিলেন ঝুম্পা। বানুও বললেন, ছোট গল্প সঙ্কলনের জন্য তিনি বুকার পাবেন, অনেকে বিশ্বাস করেননি। বানু, ঝুম্পাকে নিয়ে মালবিকার মন্তব্য, ছোট গল্পকারদের একটা ইউনিয়ন এ বার কলকাতায় খোলাই যেতে পারে!

    দখনি উর্দু এবং কন্নড়ে অভ্যস্ত বানু সাহিত্যে মুসলিম নারীকণ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিতেই ভালবাসেন। তাতেই পাঠকদের সঙ্গে বন্ধনে জড়িয়েছেন। হেসে বলেন, ‘‘পুণের যুক্তিবাদী তত্ত্বে সড়গড়, বিদগ্ধ এক পাঠক বলে গেল, নারীবাদের এমন চমৎকার ব্যাখ্যা আর কখনও পায়নি। পাকিস্তানের এক পাঠিকা রীতিমতো অভিযোগের সুরে বলেন, আমার মা, নানিদের গল্প আপনি কী ভাবে জেনে ফেললেন!’’

    বানু মনে করেন, ইসলামের নানা রীতি প্রভাবশালীদের হাতে অপব্যাখ্যার ফলে মেয়েদের এত দুর্দশা। তাঁর কথায়, ‘‘সুপ্রিম কোর্টে তালাক নিয়ে রায় ইসলাম-বিরোধী ছিল না। বিয়ে যখন পুরুষেরা একতরফা করতে পারেন না, তালাক কী ভাবে একতরফা দেবেন!’’ কট্টরপন্থী মুসলিম এবং বিভাজনপন্থী হিন্দু— সবার নিশানা হয়েছেন বানু। কলকাতাকে বলে গেলেন, ‘‘কোনও তিক্ততা নেই। আমার লেখার বিষয় আসলে ভালবাসাই!’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)