যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) তালিকায় থাকা ভোটারদের শুনানি বৃহস্পতিবার চলছিল পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর-২ ব্লকে। তাপস প্রামাণিক, লক্ষ্মীরানি শীট-সহ এলাকার অনেকেই সেখানে প্রামাণ্য নথি হিসাবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড দিতে চেয়েছিলেন। তাপসের ক্ষোভ, ‘‘দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক বললেন, ‘মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট লাগবে। অ্যাডমিট কার্ড নেওয়ার নির্দেশ আমাদের কাছে আসেনি। চাইলে, সার্টিফিকেটের সঙ্গে অ্যাডমিট কার্ড জমা দিতে পারেন’। এমন হবে কেন?’’ নির্দেশ আসেনি বলে নথিপত্রের প্রাপ্তিস্বীকারের রসিদও দেওয়া হয়নি। মহকুমাশাসক (এগরা) কর্মবীর কেশব বলেন, ‘‘এ দিন দুপুরের পরে নির্বাচন কমিশন থেকে নির্দেশিকা এসেছে। সেই মতো এ বার থেকে শুনানিতে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড জমা নেওয়া, রসিদ দেওয়া-সহ বিভিন্ন নির্দেশ মানতেবলা হচ্ছে।’’
জন্মতারিখের প্রমাণ হিসাবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড জমা দেওয়া যাবে, বুধবার রাতেই কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে চিঠি লিখে জানিয়েছিল। তবে এ দিন শুধু পূর্ব মেদিনীপুর নয়, উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, হেমতাবাদ, ইসলামপুর ব্লকে ভোটারদের কাছ থেকে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডের বদলে শংসাপত্র নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। শুনানিতে জমা দেওয়া নথির রসিদ মেলেনি বহু জায়গায়। কোথাও বলা হয়েছে, রসিদ পেতে হলে অপেক্ষা করতে হবে বা পরে নিতে হবে। কমিশন সূত্রের দাবি, কেন এ দিন মানুষের হয়রানি হল, সেই খোঁজ নেওয়া হবে। রাজনৈতিক তরজা অবশ্য তাতে থামেনি।
মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ ব্লক অফিসের শুনানিকেন্দ্রে যাওয়া তেঁতুলিয়ার আরিফ আহমেদের দাবি, “প্রথমে আমাদের নথি জমা দেওয়ার রসিদ দিচ্ছিল না। চেপে ধরায়, দিয়েছে।” বহরমপুরের পঞ্চাননতলায় পঞ্চায়েত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নথি নিয়েও রসিদ দেওয়া হচ্ছে না, এই অভিযোগে বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, শুনানির নোটিসের উপরে সিল দিয়ে লিখে দেওয়া হয়েছে উপস্থিতির কথা। তবে রসিদ মেলেনি। বহরমপুরের বিডিও অমরজ্যোতি সরকারের অবশ্য দাবি, “সব কেন্দ্রে রসিদ দিতে বলেছি।”
পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালের পরেশ মল্লিকের দাবি, “ব্লক অফিসে নথি জমা দিয়ে রসিদ চেয়েছিলাম। ইআরও বললেন, ‘কমিশনের নির্দেশ আসেনি। রসিদ দেওয়া যাবে না’।” ঝাড়গ্রামের জেলাশাসক আকাঙ্ক্ষা ভাস্কর বলেন, “নিবার্চন কমিশনের তরফ থেকে বিকেলে নোটিস এসেছে। বৈঠক হচ্ছে।” সেই জেলার খড়্গপুর মহকুমার বিভিন্ন ব্লকে অবশ্য এ দিন মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড নেওয়া হয়েছে। চাইলে, দেওয়া হয়েছে রসিদও। সবংয়ের ‘ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার’ (ইআরও) অনুপম বাগ বলেন, “আমাদের কাছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা এসেছে। তা মেনে কাজ হচ্ছে।”
পূর্ব বর্ধমানের খালাসিপাড়ার আসরাফ আলি শেখের অভিযোগ, “আমার স্ত্রী রসিদ চাইলে, তা দেওয়া হচ্ছিল না। পরে, একটি সই না থাকা প্রাপ্তিস্বীকার পত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়।” পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনের যদিও দাবি, রসিদ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম বর্ধমান প্রশাসনের দাবি, রসিদ দেওয়ার লিখিত নির্দেশ তাদের কাছে পৌঁছয়নি। তাই দেওয়া হয়নি। নির্দেশ পেলে, শুনানিতে যোগ দেওয়া ভোটারদের বাড়িতে রসিদ পৌঁছে দেওয়া হবে। জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়িতেও না চাইলে রসিদ মিলছে না বলে অভিযোগ।
তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেন, “সাংবিধানিক অধিকারকে ঢাল করে এত ভয়ঙ্কর জনবিরোধী কাজ স্বাধীন দেশে হয়নি। বিজেপির নির্দেশে কমিশন মানুষকে যে পথে ঠেলে দিয়েছে, তার প্রতিশোধ ভোটের বাক্সেই হবে।” সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, “আদালত নির্দেশ দিলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। বিজেপি যা চায়, সেই মনোভাবে চলতে গিয়ে কমিশন আদালতের নির্দেশকে মর্যাদা দিতেও দ্বিধায় ভুগছে! হেনস্থা বাড়লে মানুষের রাগ বাড়বে, তার অপেক্ষা হচ্ছে কি?”
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের পাল্টা দাবি, “নথির বিষয়ে কমিশন বলতে পারবে। কিন্তু তৃণমূল বিএলও-দের দিয়ে পরিকল্পিত ভাবে কিছু ভুল তথ্য তুলিয়ে পরিচিত, বিশিষ্টদের হয়রানির মুখোমুখি করিয়েছে। বৃদ্ধ-সহ সাধারণ মানুষের যা হয়রানি, তার জন্য দায়ী তৃণমূল।”