খাতায়-কলমে ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও) বা এইআরও-রাই ভোটারের যোগ্যতা নির্ধারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তবে চলতি এসআইআরে তাঁদের সিদ্ধান্ত অনেকাংশে নির্ভর করবে মাইক্রো অবজ়ার্ভার ও রোল-পর্যবেক্ষকদের উপর। কারণ, এক দিকে ইআরও বা এইআরও-র সিদ্ধান্তে সহমত কি না, তা জানাবেন মাইক্রো অবজ়ার্ভারেরা। অন্য দিকে, ‘বৈধ’ এবং কমিশনের তালিকাভুক্ত নথির ভিত্তিতে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, দেখবেন রোল-পর্যবেক্ষকেরা। সবক’টি স্তরে মতামত অভিন্ন হলেই কোনও ভোটার চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত হবেন বা বাদ যাবেন। কমিশন সূত্রের বক্তব্য, এই পদ্ধতি শুধু তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির (লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি) আওতায় থাকা ভোটারদের জন্য নয়, বরং ‘আন-ম্যাপড’, আপত্তি-আবেদনের (ক্লেম-অবজেকশন) আওতায় থাকা ভোটার, নতুন ভোটারের আবেদন—সবগুলিই এ ভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ রাজ্যে এসআইআর নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে। সেই পদ্ধতির উপর কড়া নজর রাখছে সুপ্রিম কোর্টও। আবার রাজ্যের শাসক দলও নানা অভিযোগ তুলছে। আইনগত দিক থেকে ভোটার বাছাইয়ের পদ্ধতি মজবুত রাখতে কমিশনের এই সিদ্ধান্ত। যাতে প্রয়োজনে পুরো পদ্ধতিটি কোর্টের সামনে পেশ করা যায়। তাতে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত সব আধিকারিকদের ভূমিকা নথিবদ্ধ থাকবে।
জেলা প্রশাসনগুলি জানাচ্ছে, ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যারে মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের ‘লগইন-আইডি’ তৈরি করা হচ্ছে। জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক সেই জেলায় কয়েকটি করে বুথের দায়িত্ব দেবেন এক জন করে মাইক্রো অবজ়ার্ভারের উপরে। ইআরও এবং এইআরও স্তরে জমা পড়া নথিগুলি আসল কি না, তা পুনর্যাচাইয়ের জন্য যাবে জেলাশাসকের কাছে। তাঁর থেকে ইতিবাচক রিপোর্ট পেলে সেই মতো সেগুলি কমিশনের সফটওয়্যারে আপলোড করবেন ইআরও এবং এইআরও। কোনও বুথের সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট মাইক্রো অবজ়ার্ভারের কাছে পৌঁছলে তিনি পুরোটা খতিয়ে দেখে নিজের মতামত দেবেন। তিনি ইআরও-এইআরওর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারেন অথবা আপত্তি জানাতে পারেন সেই সফটওয়্যারেই। এই গোটা বিষয়টি ডিজিটাল ওই মাধ্যমে নথিবদ্ধ থাকবে। সমান্তরালে আপলোড হওয়া সব নথি খতিয়ে দেখবেন রোল-পর্যবেক্ষকেরাও। তাতে কমিশনের তালিকাবদ্ধ বা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো নথি আপলোড হয়েছে কি না, দেখা হবে তা। বিধিসম্মত নয়, এমন নথি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ইআরও বা এইআরও দায়বদ্ধ থাকবেন। সেই ভোটার-আবেদনে কেন সম্মতি দিয়েছেন, তা ব্যাখ্যা করতে হবে। এক জেলা-কর্তার কথায়, “অনেক ক্ষেত্রে রেশন কার্ড, ব্যাঙ্কের পাসবই, জমি-বাড়ির দলিলের মতো এমন অনেক নথি জমা পড়ছে, যেগুলি কমিশনের তালিকাভুক্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে ইআরও-এইআরওদের একাংশ সেগুলিই আপলোড করে দিচ্ছেন। সে দিক থেকে এই পদ্ধতি বেশ কড়া।”
আগে নথি যাচাইয়ের জন্য চার জন রোল-পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছিল কমিশন। সম্প্রতি আরও ১২ জন রোল-পর্যবেক্ষক নিযুক্ত হয়েছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই কেন্দ্রের নানা মন্ত্রকের সিনিয়র অফিসার। সংশ্লিষ্টদের জাতীয় নির্বাচন কমিশন নিয়োগ করেছে সুনির্দিষ্ট আইনের আওতায়। পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা বিধিসম্মত করাই এর অন্যতম লক্ষ্য। আবার অন্য যে রাজ্যগুলিতে এসআইআর চলছে, সেখানেও এমন নিয়োগ করা হয়েছে। তবে তেমন ১২টি রাজ্যের মধ্যে এ রাজ্যে পর্যবেক্ষকের সংখ্যা সর্বাধিক।
কমিশন সূত্রের বক্তব্য, ইতিমধ্যেই প্রায় ৩১ লক্ষ ‘আন-ম্যাপড’ ভোটারের শুনানি হয়েছে। শুরু হয়েছে তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতিগুলির শুনানি। এই পর্যবেক্ষকেরা রোজ কমবেশি ১০ হাজার করে আপলোড হওয়া নথি পরীক্ষা করতে শুরু করেছেন। শুনানি যত এগোবে, সংখ্যাটা বাড়বে ও তাঁরা নিজেদের পর্যবেক্ষণ জানাবেন। তার ভিত্তিতে গোটা বিষয়টি বিবেচিত হবে।