অলকাভ নিয়োগী, বিধাননগর: মেয়েটার আছে যত্ন করে রাখা খাতার ভেতর চ্যাপ্টা গোলাপ ফুল। তবু এবছরও হলুদ গোলাপই চেয়েছিল। তবে বন্ধু এনেছে লাল। এ কারণে মিথ্যে অভিমান মেয়ের। মাটিতে রেশম হলুদ শাড়ির আঁচল লুটিয়ে পড়ছে। সে অবস্থাতেই হনহন করে হেঁটে মেলার ভিড়ে মিশে গেল। সে ভিড়ে হলুদ শাড়ি, পাঞ্জাবিই শুধু চোখে পড়ে। ফলে প্রিয় মানুষটিকে খুঁজতে হয়রান ছেলে। খুঁজে পেল যখন তখন পেটে ছুঁচো ডন মারছে। হাতে একগোছা লাল গোলাপ শুকিয়ে যায় যায়। রাগ ভাঙাতে তারপর ছ’নম্বর গেটের পাশে ফিস ফ্রাইয়ের দোকানের দিকে হাঁটা। গরম ফিস ফ্রাইয়ের স্বাদে অভিমান মিশে জল। হাঁফ ছাড়ল ছেলেটি। লাল গোলাপ এ হাত থেকে গেল ও হাতে।বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে হল সরস্বতী পুজো। সে পুজোয় বইমেলার থেকে ভালো জায়গা আর ক’টা আছে? ফলে মেলাজুড়ে এদিন জোড়ায় জোড়ায় বাসন্তী চেহারারই ভিড়। বৃহস্পতিবার সবে উদ্বোধন হয়েছে কলকাতা বইমেলার। শুক্রবার পড়েছে সরস্বতী পুজো। বিদ্যার দেবীর আরাধনায় বইমেলার থেকে ঠিকঠাক জায়গা আর কিছুই হতে পারে না। তাই গন্তব্য সল্টলেক বইমেলা মাঠ। ভেঙে পড়ল তরুণ-তরুণীদের ভিড়।শীত যায় যায়। ফলে ফ্যাশনে সমস্যা হয়নি। শাড়ি, সালোয়ার, পাঞ্জাবি-পাজামায় সেজেছে সবাই। আর প্রায় সবারই অঙ্গে ঝলমল করেছে বাসন্তী হলুদ। ১১টা নাগাদ মেলাপ্রাঙ্গণে উপস্থিত একদল তরুণ-তরুণী। গেট তখনও খোলেনি। ফলে বাইরেই চলল সেলফি, চা, আড্ডা। গেট খুলতেই সোজা বইয়ের স্টলে। প্রত্যেকেরই বক্তব্য, ‘আজ যতক্ষণ না বের করে দেবে, ততক্ষণ থাকব ভিতরে। বাড়ি ফেরার কোনও তাড়া নেই আজ।’ এসব মিলিয়ে বইমেলা প্রাঙ্গণ যেন পুজোর দিনের কলেজ ক্যাম্পাস।বিকেল গড়াতেই পিলপিল করে মানুষ। ভিড় বাড়ল। ফুড স্টলে চেয়ার পাওয়া লটারি পাওয়ার মতো হয়ে দাঁড়াল প্রায়। মেলামাঠের পিছনের দিকে সার্ভিস রোডে উপর খোলা রাস্তায় বসতে বাধা ছিল না। সেখানে দলে দলে বসে চলল সেলফি, খাওয়াদাওয়া, এটা সেটা কেনাও হল। মেলাজুড়ে ঘুরে বই নেড়েচেড়ে দেখা, কেনা, চোখ বুলিয়ে নেওয়া চলল দিনভর। বহু স্টলে ঠাকুর দেখার মতো লম্বা লাইন। তরুণ-তরুণীরা শুধু নন বহু মানুষ সপরিবারেও এসেছিলেন।খিদিরপুর থেকে এসেছিলেন দেবর্ষি সাহা। বললেন, ‘বইমেলার সঙ্গে সরস্বতী পুজো বাড়তি পাওনা। সপরিবারে আজ প্রথম এলাম। আবার আসব।’ সল্টলেকের বাসিন্দা লিরিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘বইমেলা আমাদের সবার আবেগ। ছোটবেলার বহু স্মৃতি জড়িত। চেষ্টা করি রোজই একবার করে ঘুরে যাওয়ার।’ গিল্ডের সভাপতি সুধাংশুশেখর দে বলেন, ‘সরস্বতী পুজোর জন্যই উদ্বোধনের পরদিন আড়াই লক্ষ মানুষ হাজির হয়েছিলেন। তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা অনেক। প্রায় সকলেই বইয়ের ব্যাগ নিয়েই বাড়ি ফিরেছেন। বইয়ের প্রতি পাঠকদের এই প্রেমই বইমেলাকে ধরে রেখেছে।’ -নিজস্ব চিত্র