• লিঙ্গবৈষম্য থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদ: বিরুদ্ধ বার্তা বাণীবন্দনায়
    এই সময় | ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
  • অর্ঘ্য ঘোষ, কীর্ণাহার

    দায়িত্বটা পাওয়ার পর থেকে উত্তেজনার আঁচে ফুটেছেন বছর আটত্রিশের মোনালিসা রায়। এ বার স্কুলের সরস্বতী পুজোয় পৌরোহিত্য করার দায়িত্ব বর্তেছিল সংস্কৃতের এই শিক্ষিকার উপরে। একে মহিলা, তার উপরে অব্রাহ্মণ, তায় পেশাদার পুরোহিতদের মতো মন্ত্রোচ্চারণ থেকে শুরু করে পুজোর ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে সড়গড় নন।

    ভ্রু উঠেছে অনেক। সে সবের তোয়াক্কা না করেই নিজেদের সিদ্ধান্ত অনড় ছিল বীরভূম জেলার কীর্ণাহার শিবচন্দ্র হাইস্কুল। হাতেখড়ি, পুষ্পাঞ্জলি থেকে নির্ভুল মন্ত্রোচ্চারণে ছাত্র-শিক্ষকদের চমকে দিয়েছেন মোনালিসা।

    বছর চারেক আগে পুরোহিতের অশৌচ দশার কারণে লাভপুরের একটি স্কুলে সরস্বতী পুজোয় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন এক শিক্ষিকা। তবে কীর্ণাহার হাইস্কুলের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কোনও সমস্যার কারণে নয়, সচেতন ভাবেই সরস্বতী পুজোয় ব্রাহ্মণ্যবাদ ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে বার্তা দিতে স্কুলের তরফে এক অব্রাহ্মণ শিক্ষিকাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

    গুরুদায়িত্ব, তাই সংশয়ে ছিলেন, ঠিকঠাক উতরোতে পারবেন তো? মন্ত্রোচ্চারণ এবং পুজো-পদ্ধতি রপ্ত করতে কার্যত দিনরাত এক করে ফেলেছিলেন মোনালিসা। দিনের শেষে স্কোরবোর্ড- একশোয় একশো। পেশাদার পুরোহিতদের মতো হাতেখড়ি, পুষ্পাঞ্জলি থেকে নির্ভুল মন্ত্রোচ্চারণে ছাত্র-শিক্ষকদের চমকে দিয়েছেন তিনি।

    শুক্রবার পুজো শেষ করে কীর্ণাহারের পরোটার বাসিন্দা মোনালিসা বলছেন, 'বাড়ির মন্দিরে নিত্যপুজো হয়। তাই অব্রাহ্মণ হলেও পুজো সম্পর্কে অজ্ঞ নই। তবুও সংশয় ছিল। শেষ পর্যন্ত সবার সহযোগিতায় কাজটা ঠিকঠাক সম্পূর্ণ করতে পেরেছি।'

    স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্র দিব্য রায়, দশম শ্রেণির দেবাঞ্জন ঘোষ, অরিত্র রায়, নবম শ্রেণির অপরাজেয় মুখোপাধ্যায়রা বলছে, 'এ তো সবাইকে বলার মতো একটা ঘটনা।' স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা অভিনন্দা বৈরাগীর কথায়, 'স্কুলে আগে ব্রাহ্মণ শিক্ষকরা পুজো করতেন। তাঁরা অবসর নিয়েছেন। এ বার স্কুল পরিচালন সমিতি এবং সরস্বতী পুজো কমিটি ওই শিক্ষিকাকে দিয়ে পুজো করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।'

    স্কুল পরিচালন সমিতির সম্পাদক মনোজ ঘোষ বলেন, 'স্কুলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ এবং লিঙ্গবৈষম্যের কোনও জায়গা নেই। পুজোর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। সেই কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত।' শিক্ষক অরুণ রায়ের সংযোজন, 'বৈদিক যুগে বেদজ্ঞ নারী-পুরুষ, ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ নির্বিশেষে পৈতে ধারণের প্রথা ছিল। সেই হিসেবে বলা যায় সবার পুজো করার অধিকারও ছিল। আমাদের স্কুল এই পুজোর মাধ্যমে সমাজকে একটা ভালো বার্তা দিল।'

    মোনালিসার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক উজ্জ্বলকুমার রায় এবং মা চন্দ্রা রায়। তাঁরা উচ্ছ্বসিত, 'মেয়ে পুজোর দায়িত্ব নেওয়ায় পর থেকে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। সেটা দূর হয়েছে।'

  • Link to this news (এই সময়)