• অব্রাহ্মণ কন্যার হাতেই পুজো পাচ্ছেন সরস্বতী
    এই সময় | ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
  • প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া

    প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুল দৃঢ় বার্তা দিচ্ছে সমাজকে। অব্রাহ্মণ কন্যার হাতে শাস্ত্রীয় রীতি মেনে পুজো পাচ্ছেন দেবী সরস্বতী। টানা তিন বছর এ ভাবেই বাগদেবীর আরাধনা হচ্ছে পুরুলিয়ার হুড়া ব্লকের জবড়রা হাইস্কুলে।

    শুক্রবার পূজারিনির আসনে বসেছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন কৃষি মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুদীপ্তা গরাই, তন্ত্রধারকের ভূমিকা পালন করেছেন রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন শিক্ষক স্বপনকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

    আহুতি- বিদ্যার দেবীর দল। পূজারিনির পুজোর শুরু থেকে হোমে সামনে করজোড়ে ঠায় বসে থেকেছে কচিকাঁচার আসনে বসে আচমন, পুণ্যাহবাহন, স্বস্তিবাচন, ভূমিশুদ্ধি, বেদিশুদ্ধি, আসনশুদ্ধি থেকে দেবীর অধিবাস, ঘটস্থাপন, প্রাণপ্রতিষ্ঠা এবং ষোড়শোপচারে বাগদেবীর আরাধনা শেষে পুষ্পাঞ্জলি - সবই নিষ্ঠাভরে করেছেন পড়ুয়াদের সুদীপ্তাদিদি। 'ওম বদ বদ বাগবাদিনী স্বাহা...' দেবীর সম্মুখে বসা সুদীপ্তার হোমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পুজো শেষে পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছে ছোটরা।

    প্রধান শিক্ষক শুভাশিস চক্রবর্তী বলছেন, 'পুজো মানে তো পরমাত্মার সঙ্গে মানুষের যোগ। এই পথই তো স্বামী বিবেকানন্দ দেখিয়েছেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা তো মানুষ। সেই আদর্শেই এই প্রত্যন্ত এলাকায় আমরা শিক্ষার দীপশিখাটিকে জ্বালিয়ে পথ চলছি। এই পুজো তারই অঙ্গ।'

    সুদীপ্তার কথায়, 'পুজো নিয়ে আমাদের সমাজে এখনও কিছু রক্ষণশীলতা রয়ে গিয়েছে। এই নিয়ে তিন বার পুজো করলাম এই স্কুলে। তন্ত্রধারক আমাকে যত্ন নিয়ে সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ শিখিয়েছেন।' তাঁর কথায়, 'মায়ের পুজো মেয়ে করবে, পুজোর দিনে মাকে নিজের মতো করে ডাকবে - এটাই স্বাভাবিক। আমার কাছে সেই সুযোগ এসেছে বলে আমি ধন্য।'

    এ দিন পুজোর সময়ে আগাগোড়াই স্কুলে হাজির থাকা স্কুল পরিচালন কমিটির সভাপতি প্রিয়রঞ্জন গরাই বলছেন, 'ব্রাহ্মণ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ তো জবালার সন্তান সত্যকামকে দ্বিজোত্তম ও সত্যকুলজাত বলেই অভিহিত করেছেন। পুরোহিত দিয়ে দেবীর পুজো হয়ই। বছর তিনেক আগে আমরা রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন শিক্ষক স্বপনদাকে পুজো করার জন্য বলেছিলাম।

    তাঁর তত্ত্বাবধানে সুদীপ্তার পুজো আমাদের মন ভরিয়ে দিয়েছিল। সে বার থেকেই সকলেই চেয়েছেন, পুজোটা এ ভাবেই হোক।' তন্ত্রধারক স্বপন বন্দোপাধ্যায়ের কথায়, 'পুজোয় আমরা জ্ঞানের দেবীকে সামনে বসিয়ে আরাধনা করছি। একাত্ম হচ্ছি। স্ব অহন, অহন স্ব। তিনিই আমি, আমিই তিনি। স্বামীজিও তো এভাবেই মানুষের মধ্যে দেবত্বকে খুঁজেছেন।'

    ক্লাস নাইনের পড়ুয়া অর্চিতা পরামানিক, অর্পিতা মণ্ডল, সঙ্গীতা মণ্ডল, অঙ্কিতা মাইতি, এইটের রিয়া কালিন্দী, অর্চি পরামানিকদের কথায়, 'সুদীপ্তাদিদি আগের বারও পুজো করেছিলেন। চেয়েছিলাম, এ বারও যেন দিদিই পুজো করেন। উপোস করে অঞ্জলি দিয়েছি' বলেই হাতের মুঠোয় ধরা গাঁদা-বেলপাতা কপালে ঠেকিয়ে তাঁদের স্বগতোক্তি, 'জয় মা সরস্বতী।'

  • Link to this news (এই সময়)