• ‘মুসলিমদের বাদ দেওয়ার...’, SIR নিয়ে তোপ, গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা অমর্ত্য সেনের
    এই সময় | ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
  • ‘দু’বছরের খাবার একদিনে খেতে পারবেন?’ কয়েক মাসের মধ্যে SIR করা নিয়ে এ ভাবেই নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর উত্তরকন্যায় জেলাশাসকদের সঙ্গে বৈঠকের পরে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘২-৩ মাসের মধ্যে কি পুরো ভোটার লিস্ট তৈরি করা সম্ভব?’ PTI-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনেকটা মমতার সুরেই পশ্চিমবঙ্গে চলা SIR প্রক্রিয়াকে তুলোধনা করলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তাঁর কথায়, ‘খুব সতর্ক হয়ে, পর্যাপ্ত সময় নিয়ে ভোটার তালিকায় সংশোধন করা উচিত।’ কিন্তু তাঁর অভিযোগ, ‘পশ্চিমবঙ্গে সেটা হচ্ছে না।’

    অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বয়স এখন ৯২ বছর। তিনি রয়েছেন বস্টনে। সেখান থেকেই ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে PTI-কে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। SIR-এ কার লাভ? কার ক্ষতি? এই নিয়ে খোলাখুলি নিজের মত জানিয়েছেন অমর্ত্য। তাঁকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গও তুললেন। ছুঁয়ে গেলেন সব খুঁটিনাটি। গণতন্ত্রে SIR প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে বলেই মনে করেন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ। ভোটাধিকারকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনও অস্বীকার করেন না তিনি। কিন্তু তার একটা পদ্ধতি রয়েছে জানিয়ে অমর্ত্য সেন বলেন, ‘খুব তাড়াহুড়ো করে SIR হচ্ছে। ভোটারদের নথিপত্র জমা দেওয়ার সময়টুকুও দেওয়া হচ্ছে না।’

    SIR যে ভাবে হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াকে ভোটারদের সঙ্গে অন্যায় বলে মনে করেন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ। তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘বিধানসভা নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রমাণের যথেষ্ট সুযোগ পর্যন্ত নেই। এটা ভোটারদের সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে। গণতন্ত্রের প্রতিও একপ্রকার অবিচার।’ SIR-এ ২০০২-এর ভোটার তালিকাকে ‘বেসলাইন’ ধরা হয়েছে। তবে ফর্ম ফিলআপ করতে হয়েছে সবাইকেই। তাতে কোনও ভুলভ্রান্তি থাকলে ডাকা হচ্ছে শুনানিতে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অমর্ত্যরও ডাক পড়েছিল শুনানিতে। ফলে বাংলার SIR-এর সঙ্গে তিনিও ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছেন। অমর্ত্যর কথায়, ‘জন্মের সময় আমার মৃত মায়ের কত বয়স ছিল, সেই নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। যদিও আমার মা-ও ভোট দিতেন। তাঁর সমস্ত তথ্য কমিশনের রেকর্ডেই রয়েছে।’

    বার্থ সার্টিফিকেটের মতো নথিপত্র সবার কাছে নেই। বিশেষ করে যাঁরা গ্রামে থাকেন, তাঁদের এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি। অমর্ত্যর কথায়, ‘আমি শান্তিনিকেতনের গ্রামে জন্মেছি। আমার মতো যাঁরা গ্রামে জন্মেছেন, তাঁদের অনেকেরই বার্থ সার্টিফিকেট বলে কিছু নেই। এর জন্য আমাকেও অতিরিক্ত নথি দিতে হয়েছে।’ এর পরেই হাসতে হাসতে বিটলস-এর বিখ্যাত গান ‘উইথ এ লিটল হেল্প ফ্রম মাই ফ্রেন্ডস’ গানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘বন্ধুদের সাহায্যে আমি উতরে গিয়েছি। কিন্তু যাঁদের বন্ধু নেই, তাঁদের জন্য আমার চিন্তা হয়।’ উল্লেখ্য, ভোটার তালিকায় অমর্ত্য এবং তাঁর মা অমিতা সেনের বয়সের পার্থক্যের কারণেই অর্থনীতিবিদকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল।

    তৃণমূল-সহ বিরোধীদের অভিযোগ, বিজেপির অঙ্গুলিহেলনেই কাজ করছে কমিশন। শুধু তাই নয়, বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। অমর্ত্য অবশ্য এই সব রাজনীতির মধ্যে ঢুকতে চাননি। তাঁর কথায়, ‘আমি নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ নই। শুনছি, বিজেপি নাকি লাভবান হচ্ছে। সত্যি-মিথ্যা জানি না। শুধু মনে করি, আমাদের গর্বের গণতন্ত্রে যেন দাগ না পড়ে।’ তবে এতে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষরাই যে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই প্রবীণ অর্থনীতিবিদের। তিনি বললেন, ‘স্বাভাবিক উত্তর হলো, বঞ্চিত এবং দরিদ্র মানুষরা, মুসলিম ও সংখ্যালঘুরা, নতুন ভোটার তালিকায় নাম তুলতে যে নথিপত্র দরকার, তা এদের পক্ষে জোগাড় করা কঠিন। ফলে তাঁদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কাও প্রবল।’ অমর্ত্য জানান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেকে হিন্দু, মুসলিম ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির ফসল বলে গর্ব বোধ করতেন। এই ব্যাখ্যা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবতে চান তিনি।

  • Link to this news (এই সময়)