গোপাল সাহা (কলকাতা): বাগদেবীর আরাধনায় এবার কলকাতা হাইকোর্টের নজির স্থাপন। কলকাতা হাইকোর্টের ১৫০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার বাগদেবীর আরাধনা হল মহিলা আইনজীবীদের উদ্যোগে এবং পুজো করলেন এক মহিলা পুরোহিত। কলকাতা হাইকোর্টের প্রতিষ্ঠার ১৫০ বছরের ইতিহাসে পূর্বে কখনও সরস্বতী পুজো হয়নি বলেই জানিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী সুমিত্রা নিয়োগী ভট্টাচার্য।
বলাবাহুল্য, কলকাতা হাইকোর্টের মহিলা আইনজীবীদের সংগঠন বা নিজেদের গোষ্ঠীর নাম 'জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা'। এই সংগঠনের উদ্যোগে মূলত তাঁদের সদস্যা মনিদীপা মণ্ডল, চুমকি দাস বৈরাগ্য, সর্বানী মুখার্জী, নম্রতা কুমারী, নমিতা বাসু, ছবি চক্রবর্তী প্রমুখ আইনজীবীরা অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। আর এদিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় বিষয় ছিল মহিলা পুরোহিতের পৌরহিত্য, যিনি কলকাতা হাইকোর্টের স্বনামধন্য আইনজীবী সুমিত্রা নিয়োগী ভট্টাচার্য্য। আইনজীবীদের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষদের জন্যেও ভোগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
এক নজর দেখে নেওয়া যাক কলকাতা হাইকোর্টের ইতিহাস:
কলকাতা হাইকোর্ট ১ জুলাই ১৮৬২ সালে হাই কোর্টস অ্যাক্ট, ১৮৬১ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন হাইকোর্ট এবং একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চার্টার্ড হাইকোর্ট। কলকাতায় (পূর্বনাম ক্যালকাটা) অবস্থিত এই আদালতের বিচারের ক্ষমতা পশ্চিমবঙ্গ এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। এর নব্য-গথিক স্থাপত্যশৈলীর ভবনটি নির্মিত হয় ১৮৭২ সালে।
বলাবাহুল্য, শহর কলকাতা যেমন ভারতের রাজধানী ছিল ইংরেজ শাসনকালে, পাশাপাশি কলকাতা হাইকোর্ট ও তৎকালীন সময়ে প্রথমে সুপ্রিমকোর্ট হিসাবে বিবেচিত হলেও পরে এটি সুপ্রিমকোর্ট-এর অধীনে পশ্চিমবঙ্গের হাইকোর্ট হিসেবে পরিচিত হয়। এর অধীনে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও সাব ডিভিশন কোর্ট আছে বর্তমানে।
প্রতিষ্ঠা:
কলকাতা হাইকোর্টের আনুষ্ঠানিক নাম ছিল হাই কোর্ট অব জুডিকেচার অ্যাট ফোর্ট উইলিয়াম। এটি ফোর্ট উইলিয়ামে অবস্থিত সুপ্রিম কোর্ট অব জুডিকেচারকে প্রতিস্থাপন করে গঠিত হয়।
লেটার্স পেটেন্ট:
১৮৬২ সালের ১৪ মে জারি হওয়া লেটার্স পেটেন্টের মাধ্যমে এই আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম প্রধান বিচারপতি (চিফ জাস্টিস) ছিলেন স্যার বার্নস পিকক।
প্রথম মহিলা প্রধান বিচারপতি:
ন্যায়মূর্তি মঞ্জুলা চেল্লুর ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মহিলা প্রধান বিচারপতি।
প্রথম ভারতীয় বিচারপতি:
ন্যায়মূর্তি শম্ভুনাথ পণ্ডিত ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম ভারতীয় বিচারপতি। তিনি ১৮৬৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এই পদে নিযুক্ত হন।
ভৌগোলিক বিচারিক ক্ষমতা:
প্রথমদিকে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারিক এলাকা ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত—উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে অসম পর্যন্ত, যার মধ্যে বাংলা, বিহার ও ওড়িশা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কলকাতা হাইকোর্টে ১৫০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম সরস্বতী পুজো উপলক্ষে হাইকোর্টের আইনজীবী সুমিত্রা নিয়োগী ভট্টাচার্য বলেন, "অন্যান্য কোর্টগুলিতে আইনজীবীরা সরস্বতী পুজো করলেও হাইকোর্টের ইতিহাসে এই প্রথম সরস্বতী পুজো হল। এর আগে কখনও কলকাতা হাইকোর্টে বাগদেবীর আরাধনা হয়নি। বর্তমানে Bar Association-এর বিভিন্ন ঘরে রথযাত্রার উৎসব পালন করা হলেও মা সরস্বতীর আরাধনা এই প্রথমবার। আমরা 'জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা'-এর পক্ষ থেকে এ বছর প্রথম এই উৎসব শুরু করলাম। নিজেও এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের একজন সৈনিক হিসেবে খুবই গর্বিত মনে করছি। পাশাপাশি দেবীর আরাধনা বা পৌরহিত্য নিজে করেছি ও সকলেই আমাকে এক পুরোহিতের মর্যাদা দিয়েছে। আমরা এই গোষ্ঠী তৈরি করার কথা অনুভব করি ২০২৪ সালের ৯ আগষ্ট, যেদিন বাংলায় এক নারীর প্রতি অত্যাচারের ঘটনা সারা বাংলা তথা পৃথিবী আন্দোলিত হয়েছিল। মহিলা আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আমরা কলকাতা হাইকোর্টে সরস্বতী পুজো নিয়মরীতি মেনে সাফল্যের সাথে পালন করলাম, এবং আগামীতেও এই পুজো ধারাবাহিকভাবে নিয়ম-নিষ্ঠা মেনে করা হবে।"
বলা বাহুল্য রাজ্য তথা দেশে নারী শক্তির জাগরণের পাশাপাশি শহর কলকাতায় ঐতিহ্যবাহী কলকাতা হাইকোর্টে ১৫০ বছরের ইতিহাসে বসন্ত পঞ্চমী উৎসবের উদযাপন এবং তা সম্পূর্ণ মহিলা আইনজীবীদের উদ্যোগে ও মহিলা পৌরহিত্যে এক নজির স্থাপন করেছে শহর কলকাতা তথা রাজ্যে।