সংবাদদাতা, ঝালদা: দাবি কী কইরবো, আমার ছা-টাই (ছেলে) নাই তো! দাবি আর কী! সরকার যা বুঝে কইরবেক। আমরা তো দুইজনেই রইলাম, আর কেউ নাই। পুত্রশোকে বিহ্বল বাবা রমেন লোহারের এই বুকফাটা আর্তনাদে শনিবার সকালে ভারী হয়ে উঠেছিল ঝালদার পুস্তি গ্রামের বাতাস। বীর সন্তানকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত হাজার, হাজার মানুষ। কাশ্মীরের ডোডায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো জওয়ান প্রদ্যুম্ন লোহারের কফিনবন্দি দেহ গ্রামে ফিরতেই শুরু হয় কান্নার রোল।শনিবার সকালে যখন সেনাবাহিনীর বিশেষ গাড়িতে প্রদ্যুম্নর দেহ গ্রামে পৌঁছায়, তখন কার্যত একমাত্র সন্তানের নিথর দেহ দেখে বুক ফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন মা মালা লোহার ও বাবা রমেনবাবু। এক উচ্চপদস্থ সেনা আধিকারিক যখন শহিদের বাবার হাতে তেরঙা রঞ্জিত জাতীয় পতাকা তুলে দেন, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন উপস্থিত সবাই। কান্নাভেজা গলায় রমেনবাবু বলেন, আমার ব্যাটা সেনাবাহিনীতে চাকরি করত। আমি গর্বিত। এই ভারতের পতাকা আমার হাতে এসেছে, এই আমার ছেলে দেশের জন্য কাজ করেছে তার প্রমাণ। এর মধ্যেই আমি আমার ছেলেকে খুঁজে পাব। উপস্থিত সবার মুখে তখন একটাই ধ্বনি, ‘ভারত মাতা কি জয়’।গত ২২ জানুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ কাশ্মীরের ডোডা জেলায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় আড়াইশো ফুট নিচে খাদে পড়ে যায় একটি সেনার গাড়ি। ঘটনাস্থলেই প্রদ্যুম্ন-সহ ১০ জন জওয়ান শহিদ হন। শহিদ জওয়ানের খুরতুতো ভাই ভগীরথ লোহার বলেন, শেষবার ফোনে কথা হওয়ার সময় প্রদ্যুম্ন পাহাড়ের ওপর ডিউটিতে ছিলেন। জানিয়েছিলেন, নিচে ফিরলেই ছুটির আবেদন করবেন। শেষ দুর্গাপূজার সময় বাড়ি এসেছিল প্রদ্যুন্ম। ওর বাবা-মায়ের আর তো কেউ নেই, আমি চাইব কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের শহিদের পরিবারের জন্য যে তহবিল দরকার হয়, সেটা যাতে লাগু হয়। কিন্তু ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরা আর হল না প্রদ্যুন্মের। ঘরে ফেরার আগেই চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেলেন শান্ত স্বভাবের ওই তরুণ।এদিন সকালে শহিদ জওয়ানের স্কুল পুস্তি অঞ্চল উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর দেহ রাখা হলে সবাই পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। উপস্থিত ছিলেন পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো, বাঘমুন্ডির বিধায়ক সুশান্ত মাহাতো এবং প্রাক্তন বিধায়ক নেপাল মাহাতো। পরে সুবর্ণরেখা নদীর ঘাটে সেনাবাহিনী কর্তৃক গান স্যালুট প্রদানের মাধ্যমে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। প্রাক্তন বিধায়ক নেপাল মাহাতো বলেন, ছোট থেকেই দেশের সেবা করার স্বপ্ন ছিল প্রদ্যুম্নর। আজ দলমত নির্বিশেষে গোটা ঝালদা কাঁদছে। সরকারের কাছে দাবি রাখব, ওঁর নাম যেন ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকে।বিধায়ক সুশান্ত মাহাতো শহিদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে জানান, রাজ্য সরকার সব সহযোগিতা করবে। অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। তিনি বলেন, এত বড় একটা ঘটনায় কোনও আইএএস বা আইপিএস অফিসার উপস্থিত না থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক।