দিনে ভোটার রক্ষা আর রাতে সিনেমা, দলকে দ্বিমুখী নির্দেশ অভিষেকের
দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
শনিবার বিকেলে রাজ্যজুড়ে প্রায় এক লক্ষ পদাধিকারী ও জনপ্রতিনিধিকে নিয়ে আয়োজিত এক মেগা ভার্চুয়াল বৈঠক থেকেই এই দ্বিমুখী কর্মসূচির ঘোষণা করেন অভিষেক। বৈঠক থেকে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘ভোটারদের অধিকার রক্ষায় কোনও ঢিলেমি চলবে না। দিনের আলো থাকতে থাকতে এসআইআরের কাজ শেষ করতে হবে। আর সন্ধ্যা নামলেই নামতে হবে মানুষের কাছে সরকারের কাজ পৌঁছে দিতে।’
এই বৈঠকেই তিনি অভিযোগ করেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বহু জায়গায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ সংক্রান্ত নোটিস নিয়মমাফিক টাঙানো হয়নি। কোথাও নিয়ম মানা হচ্ছে না, কোথাও আবার শুনানির প্রক্রিয়াই কার্যত অদৃশ্য। তাঁর কথায়, ‘শুধু চিঠি চালাচালি করে এই অন্যায় রোখা যাবে না। মাঠে নেমে লড়াই করতে হবে।’
প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের প্রকল্পগুলিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে একটি চলচ্চিত্র—‘লক্ষ্মী এল ঘরে’। রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত এই ছবিতে অভিনয় করেছেন শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, অঙ্কুশ হাজরা, সোহিনী সেনগুপ্ত-সহ একাধিক পরিচিত মুখ। আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য সরকারের তথ্যসংস্কৃতি দপ্তর এই ছবি নির্মাণের দায়িত্বে থাকলেও, দলীয় সূত্রের খবর, এই প্রকল্পের ভাবনা ও পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরই।
শনিবারের বৈঠকে অভিষেক দলকে স্পষ্ট নির্দেশ দেন—দিনের বেলা এসআইআর সংক্রান্ত দায়িত্ব শেষ করে সন্ধ্যার পর পাড়ায় পাড়ায় পর্দা টাঙিয়ে ওই ছবি দেখাতে হবে। যে পাড়ায় যেদিন ছবি দেখানো হবে, তার আগেই সেখানে মাইকে প্রচার চালাতে হবে, যাতে স্থানীয় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেটি দেখতে আসেন।
এই কর্মসূচিতে স্থানীয় নেতৃত্বকে কিছুটা ‘স্বাধীনতা’ও দিয়েছেন অভিষেক। বৈঠকে তিনি বলেন, ‘শুনছি, অনেক জায়গায় সিনেমা দেখানোর পর খাওয়াদাওয়ার আয়োজনও হচ্ছে। সেটা আপনাদের এক্তিয়ার। আপনারা করতেই পারেন।’ তৃণমূলের অন্দরমহলে এই মন্তব্যকে কৌশলী বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে—শুধু সিনেমা দেখানো নয়, মানুষের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের বন্ধন জোরদার করাও যে সমান জরুরি, সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন অভিষেক।
প্রসঙ্গত, শনিবার বিকেল চারটে থেকে শুরু হওয়া এই মেগা ভার্চুয়াল বৈঠকে রাজ্যের সর্বস্তরের প্রতিনিধিরা যোগ দেন—বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ-২), সাংসদ, বিধায়ক, পঞ্চায়েত ও পুরসভা স্তরের জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব। বৈঠকের শুরুতেই অভিষেক বিস্ফোরক অভিযোগ করেন। বলেন, অপরিকল্পিত এসআইআর প্রক্রিয়ার জেরে এখনও পর্যন্ত ১২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আতঙ্ক ও প্রশাসনিক চাপে সাধারণ ভোটার ও বিএলও-দের প্রাণ হারানোর ঘটনাকে তিনি ‘অমানবিক’ বলে বর্ণনা করেন।
তিনি জানান, এসআইআর প্রসঙ্গে তিনি নিজে তৃণমূলের দশ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে দিল্লিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার উপস্থিত থাকলেও তাঁদের প্রশ্নের কোনও সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি বলেই তাঁর অভিযোগ। অভিষেকের দাবি, এই প্রক্রিয়ার ফলে রাজ্যে প্রায় ১.৩৬ কোটি ক্ষেত্রে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ তৈরি হয়েছে। এমনকি অমর্ত্য সেন, মহম্মদ সামি এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যরাও এই বিভ্রান্তিকর প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকে আরও অভিযোগ ওঠে, বহু জায়গায় শুনানির সময় তৃণমূলের বুথ লেভেল এজেন্টদের উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয়নি। অভিষেক স্পষ্ট বলেন, ‘নির্বাচন হোয়াটসঅ্যাপে লড়া যায় না।’ বিএলএ-২-দের উপস্থিতির দাবিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে একাধিক দফায় তর্কাতর্কির কথাও তিনি তুলে ধরেন। পাশাপাশি অভিযোগ করেন, বাংলায় কেবল মাইক্রো অবজার্ভার মোতায়েন করা হচ্ছে, যা কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাবের প্রতিফলন। এই প্রেক্ষিতেই বিজেপিকে তিনি ‘বাংলা-বিরোধী শক্তি’ বলে আক্রমণ করেন।
এসআইআর মোকাবিলায় সংগঠনকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যত হাতে রয়েছে মাত্র ২২ দিনের মতো সময়। সামনে প্রায় ১০০ দিন থাকলেও, এই সময়ের মধ্যেই সংগঠনের পূর্ণ শক্তি কাজে লাগাতে হবে। ভোটার তালিকা প্রকাশের পর সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে শুনানি প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেন তিনি। পাশাপাশি তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সব বিএলএ-২ ও বুথ সভাপতিদের নিয়ে বুথভিত্তিক ‘ভোটরক্ষা কমিটি’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
দলের ওয়ার রুমগুলি ঠিকমতো কাজ করছে না বলেও প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দেন অভিষেক। নাম না করে সাংসদ ও বিধায়কদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব পেলেই তা পালন করতে হবে, নচেৎ দল পাশে দাঁড়াবে না।’ সাংসদদের উদ্দেশে নির্দেশ দেওয়া হয়, সংসদের অধিবেশনে এক-দু’দিন উপস্থিত থেকে বাকি সময় নিজেদের এলাকায় থাকতে হবে। আত্মতুষ্টি ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধেও তিনি সতর্ক করেন।
ফর্ম ৭ ইস্যুতে বিজেপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, তৃণমূল সমর্থকদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিজেপি একসঙ্গে বহু ফর্ম জমা দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাঁকুড়া-সহ একাধিক জায়গায় এই চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। একসঙ্গে ১০টির বেশি ফর্ম জমা দেওয়া আইনত অপরাধ এবং এর জন্য সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে—এই হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে ২৫ জানুয়ারি জাতীয় ভোটার দিবসে রাজ্যজুড়ে ব্লকস্তরে প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক। ভোটারদের অধিকার রক্ষায় কর্মী ও সমর্থকদের ব্লকে ব্লকে রাস্তায় নামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি জানান, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ ইস্যুতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকার ফলে সুপ্রিম কোর্টও তৃণমূলের উত্থাপিত সমস্যাগুলির যৌক্তিকতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এসআইআর ইস্যুতে এই দ্বিমুখী কৌশল—একদিকে ভোটার অধিকার রক্ষার আন্দোলন, অন্যদিকে সরকারের প্রকল্পের সামাজিক প্রচার—আগামী দিনে তৃণমূলের সাংগঠনিক রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিতে চলেছে।