• পলিটিক্যাল রিপোর্টিং দুর্বল, না ধারায় বদল!
    এই সময় | ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: ‘আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি।’ এ প্রশ্ন চিরন্তন। এ প্রশ্নের যেমন মৃত্যু নেই, তেমন উত্তরও নেই বোধহয়। তেমনই এক প্রশ্ন—‘বাংলায় পলিটিক্যাল রিপোর্টিং কি চিরকালই দুর্বল?’ এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কি সত্যিই সম্ভব? বাঙালি চিরকালই তর্কবাগীশ। ফলে এই প্রশ্ন কোনও বিতর্ক সভায় না ফেলে যদি আলোচনা সভায় করা যায়, তা হলেও জোরদার তর্ক শুরু হতে বাধ্য। তেমনই ঘটল শনিবার সন্ধ্যায়—কলকাতা বইমেলা চত্বরে, ‘এই সময়’–এর প্যাভিলিয়ন—১৯৮ নম্বর স্টলে।

    বাংলায় পলিটিক্যাল রিপোর্টিং চিরকালই দুর্বল কি না, তা নিয়ে আলোচনায় ছিলেন দু’জন পরিচিত, সিনিয়র সাংবাদিক—জয়ন্ত ঘোষাল এবং শুভাশিস মৈত্র। অবধারিত ভাবেই তাঁদের কাছে গেল প্রশ্নটা!—‘বাংলা সাংবাদিকতার সে দিন, সুদিন কি সত্যিই গিয়েছে?’ তার সঙ্গে উঠল আরও একটা প্রশ্ন—‘বাংলায় পলিটিক্যাল রিপোর্টিংয়ে আদৌ কি সুদিন ছিল কখনও?’

    এই দুই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা জবাব দিলেন জয়ন্ত। তাঁর কথায়—‘আগের সব ভালো ছিল, আর এখন সব খারাপ। বিষয়টা মোটেই তেমন নয়। একই ভাবে এখন সবই মারকাটারি, আগে কিছুই ছিল না, এটাও িঠক নয়। ফলে প্রশ্নটা আপেক্ষিক। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় বা বরুণ সেনগুপ্তর পরে আর কিছুই হয়নি—এটাও ঠিক নয়।’ তিনি মনে করেন, কোনও একটি বিষয় বা নির্দিষ্ট একটি ব্রেকিং নিউজ়কে বেঞ্চমার্ক ধরাটা ভুল। তা হলে ধরে নেওয়া হবে যে, ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ বা ‘পেন্টাগন পেপার্স’-এর পরে কোনও ব্রেকিং নিউজ়ই হয়নি। তবে জয়ন্ত মনে করেন, বাংলায় পলিটিক্যাল রিপোর্টিংয়ে হয়তো কিছুটা হলেও দুর্বলতা আছে।

    শুভাশিস আবার মনে করেন, এই দুর্বলতার কিছুটা বাস্তব কারণও রয়েছে। যে সময়ের সাংবাদিকতাকে বাংলার স্বর্ণযুগ ধরা হয়, েসই সময়ের থেকে বর্তমান সময় অনেকটাই আলাদা। তাঁর, ‘এখন সোশ্যাল মিডিয়া অনেক বেশি শক্তিশালী। যা আগে ছিলই না। আবার এখন প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে, সাংবাদিকদের সব সময়েই সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে থাকতে হয়। সাংবাদিকদের উপরে এই নজরদারির ফলে অনেক সময়েই জানলেও তাঁরা ব্রেকিং নিউজ় দিতে পারেন না। কারণ, এখন খুব সহজেই চিহ্নিত হয়ে যায়, খবরের ‘সোর্স’, অর্থাৎ যে বা যাঁর মাধ্যমে এই খবরটা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের কাছে এসেছে।’

    জয়ন্তও একমত হলেন শুভাশিসের সঙ্গে। তিনিও মেনে নিলেন, এখন পলিটিক্যাল রিপোর্টিং করাটা অনেক বেশি কঠিন। এখন পোস্ট টেলিভিশনের যুগ। তার ফলে সাংবাদিকদের অনেক বেশি সচেতন থাকতে হচ্ছে। জয়ন্তর কথায়, ‘এখন তো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোই সমাজমাধ্যমে, ইউটিউবে সব কিছুই সবার আগে দেওয়ার জন্য নিজস্ব চ্যানেল তৈরি করেছে।’ একই কথা বললেন শুভাশিসও।

    তিনি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী হয়তো কোথাও প্রশাসনিক বৈঠক করছেন। সেই বৈঠকে অসন্তুষ্ট হয়ে কোনও অফিসার, মন্ত্রী বা দলের সহকর্মীকে বকাঝকা করলেন। সেই খবর বের করে আনাটাই তো সাংবাদিকদের কাজ। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী এই বৈঠক সমাজমাধ্যমে লাইভ করে দিচ্ছেন। আরজি কর আন্দোলন পর্বে আমরা দেখেছি, আন্দোলনরত চিকিৎসকেরা বারবার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক লাইভ সম্প্রচার চেয়েছিলেন এই জন্যই।’

    দু’জনেরই মত এতে হয়তো স্বচ্ছতা থাকছে কিন্তু সাংবাদিকদের কাজের পরিসর কমছে। তবে শাসকের রক্তচক্ষুর ভয় আগেও যেমন ছিল, তেমনই আছে। তবে অন্য রাজ্যের তুলনায় বাংলায় তা কম। সব মিলিয়ে বাংলায় পলিটিক্যাল রিপোর্টিংয়ের ধারা বদলেছে। কিন্তু, সেটা দুর্বল আগেও ছিল না, এখনও দুর্বল নয়।

    দুই সাংবাদিকের এই বিতর্কসভায় ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিদিনই বইমেলায় ‘এই সময়’–এর প্যাভিলিয়নে—১৯৮ নম্বর স্টলে থাকছে এই রকমই কিছু মনোগ্রাহী আলোচনাসভা। সঙ্গে অ্যাঙ্কর হান্ট ও কুইজ। থাকছে সেলিব্রিটিদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগও।

  • Link to this news (এই সময়)