• মামাকে আনতে যাওয়ার আনন্দ বদলেছে দুঃস্বপ্নে
    আনন্দবাজার | ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
  • সরস্বতী পুজোয় চেন্নাই থেকে ছেলে কলকাতায় আসছেন। গাড়িতে মেয়ের ঘরের নাতনিকে নিয়ে তাই ছেলেকে বিমানবন্দর থেকে আনতে যাচ্ছিলেন বছর পঁয়ষট্টির সৌমিত্রশঙ্কর দাস। বিদেশ থেকে আসা নাতনির আনন্দ, মামাকে আনতে যাচ্ছে সে নিজে! কিন্তু সেই আনন্দের যাত্রাই এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে সৌমিত্রশঙ্করের কাছে। তাঁর গাড়ির চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে পর পর পিষে দিয়েছেন তিন জনকে। এর মধ্যে রাস্তায় বাসের অপেক্ষায় থাকা এক জনের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে। হাত ভেঙেছে সৌমিত্রশঙ্করেরও। শুধু কোনও মতে রক্ষা পেয়েছে তাঁর বছর সাতেকের নাতনি!

    শুক্রবারের সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে শনিবার প্রৌঢ় বললেন, ‘‘কোনও মতে নাতনিকে জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে টেনে নিয়েছিলাম। এক হাতে নাতনিকে ধরে, অন্য হাতে চাপ দিয়ে সিট ধরে রাখতে গিয়েই বাঁ হাতটা ভেঙে গিয়েছে।’’ আতঙ্ক কাটেনি সেই ছোট্ট মেয়েরও। গাড়িতে চড়ার প্রসঙ্গ উঠলেই বদলে যাচ্ছে তার চোখ-মুখ। দিনকয়েকের মধ্যেই তার মায়ের সঙ্গে বাবার কাছে আমেরিকায় চলে যাওয়ার কথা।

    ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার, সরস্বতী পুজোর সকালে। সিআইটি রোড ধরে আসার সময়ে একটি হ্যাচব্যাক গাড়ি ইএসআই হাসপাতালের কাছে পর পর কয়েক জন পথচারীকে পিষে দিয়ে ফুটপাতে উঠে যায়। সেখানে একটি গাছ ও বাতিস্তম্ভ ভেঙে দেয় গাড়িটি। পুলিশের অনুমান, গাড়িটির গতি অত্যন্ত বেশি ছিল। ঘটনার অভিঘাতে পর পর কয়েক জনকে রাস্তায় পড়ে কাতরাতে দেখা যায়। মানিকতলা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত কয়েক জনকে হাসপাতালে পাঠায়। তার মধ্যে মইদুল ইসলাম নামে হাড়োয়ার বাসিন্দা এক যুবককে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে মৃত ঘোষণা করা হয়। গাড়িতে থাকা সৌমিত্রশঙ্করকে ভর্তি করানো হয় ই এম বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে।

    পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই গাড়িতে ‘অ্য়াডভোকেট’ স্টিকার লাগানো ছিল। গাড়িটি কেনা হয়েছিল সুতপা দাস নামে এক প্রৌঢ়ার নামে। সুতপা সৌমিত্রশঙ্করের স্ত্রী। তাঁদের মেয়ে কলকাতা হাই কোর্টে চাকরি করেন। এ দিন সুতপার ঠিকানায় পৌঁছে জানা যায়, তাঁর মেয়ে এবং মেয়ের ঘরের নাতনি আমেরিকায় জামাইয়ের কাছে চলে যাচ্ছেন। তার আগে দিদির সঙ্গে দেখা করতে সরস্বতী পুজোর দিনই কলকাতায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সুতপার একমাত্র ছেলে। চেন্নাই থেকে ফেরার সেই বিমানের সকাল সাড়ে ন’টায় কলকাতা বিমানবন্দরে নামার কথা ছিল। সৌমিত্রশঙ্কর জানান, এমনিতে তাঁরা গাড়িচালক ভাড়ায় নেন। মাঝেমধ্যে তাঁদের গাড়ি চালান মানিকতলা এলাকারই বাসিন্দা রাজা নামে এক যুবক। সে দিন সকাল ৯টা ২০ মিনিট নাগাদ রাজাকে নিয়েই তিনি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন। হাতে সময় কম থাকলেও চালককে আস্তেই যেতে বলা হয়েছিল বলে সৌমিত্রশঙ্করের দাবি। তিনি বলেন, ‘‘কী হল, বুঝলাম না। সিআইটি রোডের কিছু আগে থেকে হঠাৎ গতি অত্যন্ত বাড়িয়ে দিল ছেলেটি। পরে শুনলাম, পুলিশকে বলেছে, ওর নাকি শরীর খারাপ করেছিল, চোখে অন্ধকার দেখছিল। কোনটা ঠিক, পুলিশ দেখছে।’’

    সরস্বতী পুজোর রাতে ওই মানিকতলা থানারই ই এম বাইপাসে মোটরবাইক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে সঞ্জয় দাস নামে বছর চল্লিশের এক যুবকের। সেই ঘটনায় আহত হয়েছেন পিছনের আসনে থাকা সোমনাথ দাস নামে চব্বিশ বছরের আর এক জন। উল্টোডাঙা থেকে চিংড়িঘাটার দিকে যাওয়ার রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরবাইকটি উল্টে যায়। পিছনে থাকা একটি লরি বাইকচালককে পিষে দেয়।

    এ দিকে, শনিবার বেলা ১১টা নাগাদ কালীঘাটের সদানন্দ রোডে মোটরবাইকের ধাক্কায় মৃত্যু হয়েছে ঝর্না চক্রবর্তী নামে ৫০ বছরের এক মহিলার। পুলিশ বাইকটির খোঁজ চালাচ্ছে। অন্য একটি ঘটনায় এ দিন ভোরে পার্ক স্ট্রিটে দীপান্বিতা মুখোপাধ্যায় নামে এক মহিলাকে ধাক্কা মেরে চম্পট দেয় একটি বেপরোয়া গাড়ি। মহিলাকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও গাড়িটির খোঁজ চালাচ্ছে পুলিশ।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)