তাঁর কাছে ভারত মানে ছিল এক অবিরাম চলার ছন্দ, কোনও ‘ফুল স্টপ’ নেই। কালের অমোঘ নিয়মে আজ সেই মানুষটাই চিরবিরাম নিলেন। চলে গেলেন ভারত তথা কলকাতার সেই ‘আপনজন’, কিংবদন্তি সাংবাদিক তথা প্রখ্যাত লেখক স্যর মার্ক টালি। রবিবার বিকেলে দিল্লির সাকেতের এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
মার্ক টালির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিছক পেশাগত ছিল না, যোগ ছিল নাড়ির। ১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর এই তিলোত্তমা কলকাতাতেই তাঁর জন্ম। দীর্ঘ ২২ বছর তিনি বিবিসি (BBC)-র দিল্লি ব্যুরো চিফের দায়িত্ব পালন করেছেন।
জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়াণ কিংবা রাজীব গান্ধীর জমানা— ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে তাঁর কণ্ঠস্বর কোটি কোটি ভারতীয়র কাছে ছিল ধ্রুবতারার মতো সত্য, ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। আজও ভারতের প্রবীণ প্রজন্মের কানে অনুরণিত হয় বিবিসির রেডিয়োয় তাঁর সেই চেনা কণ্ঠ, ‘মার্ক টালি বলছি’।
এ দিন তাঁর প্রয়াণ সংবাদ জানান তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু তথা সহকর্মী জ্যাকব সতীশ। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সতীশ বলেছেন, ‘আজ বিকেলে ম্যাক্স হাসপাতালে শেষ বিদায় নিয়েছেন মার্ক’। গত এক সপ্তাহ ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে এই হাসপাতালেই চিকিৎসা চলছিল তাঁর।
সংবাদ জগতের বাইরে লেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ‘নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া’, ‘ইন্ডিয়া ইন স্লো মোশন’ কিংবা ‘দ্য হার্ট অফ ইন্ডিয়া’-র মতো তাঁর প্রতিটি বই ভারতকে এক নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শিখিয়েছে।
তিনি বলতেন, ভারতকে কেবল পশ্চিমী চশমায় বিচার করা ভুল। এই দেশের প্রকৃত রূপ লুকিয়ে আছে এর বৈচিত্র্যময় ও অবিরাম বয়ে চলা জীবনের গভীরে। ভারতীয় আমলাতন্ত্রের জটিলতা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াই অত্যন্ত নিপুণ ভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন, কিন্তু ভারতের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং ভারতীয়দের অদম্য মানসিকতার প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধাও প্রকাশ করেছেন একের পর এক গ্রন্থে।
সাংবাদিকতায় তাঁর অনন্য অবদানের জন্য ২০০২ সালে তাঁকে নাইটহুড সম্মান দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। ২০০৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করেছিল। মার্ক টালির প্রয়াণে ভারত হারাল এক অকৃত্রিম বন্ধুকে। যাঁর কলম কখনও সত্য বলতে দ্বিধা করেনি।