জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দক্ষিণ কলকাতার প্রাণকেন্দ্র হাজরা মোড় (Hazra More)। সেখানেই শতাব্দীপ্রাচীন শিক্ষার পীঠস্থান—আশুতোষ কলেজ (Asutosh College)। সেই একই চত্বরে দিনে ও রাতে চলে আরও দুটি কলেজ, শ্যামাপ্রসাদ ও যোগমায়া দেবী কলেজ (Yogmaya Devi College)।
একই ক্যাম্পাস থেকে পরিচালিত এই তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়’ (Autonomous University) গড়ার ঐতিহাসিক ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। শুক্রবার সরস্বতী পুজোর পুণ্যলগ্নে নিজের পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে তিনি এই মেগা প্রকল্পের সবুজ সংকেত দেন।
নির্বাচনী আবহে এই ঘোষণা কলকাতার ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষামহলে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আপাতত মৌখিক সম্মতি দিলেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের কারণে এখনই এটি বিধানসভায় পেশ করা সম্ভব নয়। তবে ভোটের পরই এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
‘এক পরিবার, এক বিশ্ববিদ্যালয়’
শুক্রবার সকালে রেড রোডে নেতাজির মূর্তিতে মাল্যদান সেরে মুখ্যমন্ত্রী সোজা চলে আসেন তাঁর ‘আলমা মেটার’ আশুতোষ কলেজ প্রাঙ্গণে। সেখানে যোগমায়া দেবী কলেজের সরস্বতী পুজোয় অংশ নেন তিনি। দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, একই চত্বরে থাকা এই তিন কলেজকে মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হোক। এ দিন তিন কলেজের অধ্যক্ষরা সম্মিলিতভাবে এই প্রস্তাবটি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পেশ করলে তিনি তাতে সবুজ সংকেত দেন।
পরিদর্শনকালে মুখ্যমন্ত্রী তিন কলেজের আলাদা আলাদা সরস্বতী পুজো দেখে কিছুটা কৌতুকের সুরে বলেন, 'তিনটি পুজো আলাদা না করে এক জায়গায় করলেই তো ভালো হত'। তাঁর এই মন্তব্যকে তিন প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিকভাবে ‘এক ছাতার তলায়’ আনার চূড়ান্ত ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।
ঐতিহ্যের পুনর্জন্ম
আশুতোষ কলেজ শতবর্ষ প্রাচীন। শ্যামাপ্রসাদ ও যোগমায়া দেবী কলেজেরও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। এই তিন কলেজের পরিকাঠামোকে একত্রিত করলে একটি শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব, যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর থেকেও চাপের বোঝা অনেকটা কমাবে। এখন কেবল বিধানসভা নির্বাচন মিটে যাওয়ার অপেক্ষা। যদি সত্যিই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা হবে দক্ষিণ কলকাতার উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
মুখ্যমন্ত্রী সম্মতি দিলেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠন কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। বর্তমানে রাজভবনের সঙ্গে রাজ্য সরকারের শিক্ষা সংক্রান্ত সংঘাত চরমে। উপাচার্য নিয়োগ এবং একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় বিল নিয়ে রাজ্যপাল ও নবান্নের দড়িট টানাটানি চলছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল রাজভবনের অনুমোদন পাবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা থেকেই যাচ্ছে।
কেন স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়?
২০১৮-১৯ সাল থেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা এই তিন কলেজ স্বশাসিত হওয়ার পরিকল্পনা করছিল। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় হলে নিম্নলিখিত সুবিধাগুলি পাওয়া যাবে:
স্বায়ত্তশাসন: পঠনপাঠন ও সিলেবাস তৈরিতে কলেজগুলি অনেক বেশি স্বাধীনতা পাবে।
গবেষণার সুযোগ: নিজস্ব গবেষণাগার ও পিএইচডি করানোর সুযোগ তৈরি হবে।
কর্মমুখী শিক্ষা: সমসাময়িক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন কর্মমুখী বিষয় চালু করা সহজ হবে।
নামকরণ: প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কী হবে, তা অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর ওপরই ছেড়ে দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলেজের অধ্যক্ষ ড. অপূর্ব চক্রবর্তী বলেন, “এই তিন কলেজ আসলে একটাই পরিবার। আমরা তিন অধ্যক্ষই এই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছি। মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস আমাদের অনেক বড় পাওনা।”
ঐতিহ্যের পরিসংখ্যান: কেন এই দাবি সংগত?
এই তিনটি কলেজের সম্মিলিত শক্তি যেকোনো বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমতুল্য।
একনজরে দেখে নেওয়া যাক কেন এই তিন প্রতিষ্ঠানকে মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গড়া যুক্তিসঙ্গত:
২৫০ বছরেরও বেশি (আশুতোষ কলেজ ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত)মোট ছাত্রছাত্রী সংখ্যাপ্রায় ১৫,০০০ থেকে ১৮,০০০ (তিনটি কলেজ মিলিয়ে)
বিভাগের সংখ্যা- কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য মিলিয়ে প্রায় ৫০টিরও বেশি বিষয়
বর্তমান অবস্থান- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাকেন্দ্র
প্রস্তাবের নেপথ্যে: স্বশাসন ও আধুনিকীকরণের লক্ষ্য
২০১৮-১৯ সাল থেকেই এই তিন কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র পরিচিতি চাইছিল।
কেন এই রূপান্তর প্রয়োজন?
১. গবেষণার স্বাধীনতা: বিশ্ববিদ্যালয় হলে ছাত্রছাত্রীরা সরাসরি এখানেই পিএইচডি (PhD) করার সুযোগ পাবেন।
২. আধুনিক পাঠ্যক্রম: বর্তমান চাকরির বাজারের কথা মাথায় রেখে ডেটা সায়েন্স, এআই (AI) বা সমসাময়িক বিদেশি ভাষার মতো বিষয়গুলি দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে।
৩. প্রশাসনিক গতি: পরীক্ষার ফল প্রকাশ বা শংসাপত্র পাওয়ার জন্য আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর দীর্ঘ প্রতীক্ষা করতে হবে না।
মুখ্যমন্ত্রীর দাওয়াই: "ভোট মিটলেই কাজ শুরু"
এ দিন যোগমায়া দেবী কলেজে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে দেন। তিনি জানান, সামনেই বিধানসভা নির্বাচন, তাই এই মুহূর্তে বিধানসভায় কোনও নতুন বিল আনা বা ‘টেবিল’ করা সম্ভব নয়। তবে তিনি অধ্যক্ষদের আশ্বস্ত করে বলেন, “আপনারা লিখিত প্রস্তাব কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে পাঠান। নির্বাচনের পর আমরা এই প্রক্রিয়া শুরু করব।”
মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশের পরই তিন কলেজের অন্দরে সাজ সাজ রব শুরু হয়েছে। অধ্যক্ষ ড. মানস কবি ও ড. অপূর্ব চক্রবর্তীর মতে, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এই অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার ভোলবদল।
রাজভবন ও আইনি জটিলতার কাঁটা: মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিলেও আগামীর পথ খুব একটা মসৃণ নাও হতে পারে। শিক্ষামহলের মতে:
রাজভবনের ভূমিকা: বর্তমানে রাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল রাজভবনে আটকে রয়েছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল নিয়ে রাজ্যপাল কী অবস্থান নেবেন, তা নিয়ে জল্পনা রয়েছে।
আর্থিক সংস্থান: তিনটি কলেজকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করতে বড় মাপের পরিকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন, যার জন্য বিপুল তহবিলের দরকার।
উপসংহার: আবেগের জয়
আশুতোষ কলেজের প্রাক্তনী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজেদের মাঝে পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা যেমন আপ্লুত, তেমনই শিক্ষকরাও নতুন স্বপ্ন দেখছেন। কলেজের দেওয়ালে দেওয়ালে এখন একটাই আলোচনা— ‘আশুতোষ গ্রুপ অফ ইউনিভার্সিটি’র নাম কী হবে? কেউ বলছেন ‘আশুতোষ বিশ্ববিদ্যালয়’, কেউবা অন্য কিছু। তবে নামকরণের চাবিকাঠি মুখ্যমন্ত্রী নিজের হাতেই রেখেছেন। তবে আশুতোষ কলেজের প্রাক্তনী মমতার আবেগ এবং দক্ষিণ কলকাতার এই তিন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রভোটের সমীকরণ— সব মিলিয়ে এই ঘোষণা রাজনৈতিকভাবেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ কলকাতার এই তিন ‘একান্নবর্তী’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন এক নতুন ঠিকানার অপেক্ষায়। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নবান্ন এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত করে, সেদিকেই তাকিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ।